রাজ্জাক-কবরীর পর্দা কাঁপানো অমর প্রেম

মুম্বাইয়ের দিলীপ কুমার-মধুবালা, কলকাতার উত্তম-সুচিত্রা বা লাহোরের নাদিম-শবনমরা যেমন রুপালি পর্দায় বাস্তব প্রেমের মিথ তৈরি করেছেন তেমনি ঢাকার সিনেমায় সাদাকালো যুগ রঙিন হয়েছিল রাজ্জাক-কবরীর প্রেম। প্রেম শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথাও নয়, ভার্চুয়াল জগতের চ্যাটিং প্যানপ্যানানি নয়। একটুখানি চোখের পলকেই প্রেমের অসাধারণ প্রকাশ হতে পারে। এক মিনিটেই অনেক কিছু বলা সম্ভব কিছু না বলেই। এসব মানসিক ব্যাপার স্যাপার রাজ্জাক-কবরী জুটির প্রেম থেকেই বাঙালিরা সব শিখে ফেলেছিলেন। বাংলাদেশি সিনেমা জগতের নক্ষত্র প্রেমজুটি রাজ্জাক-কবরী।
একের পর এক সুপারহিট সিনেমা এসেছে এ দুই তারকার দুর্দান্ত কেমিস্ট্রিতে। সিনেমায় রাজ্জাক-কবরী মানেই পয়সা উসুল, এমনই চিত্র ছিল তৎকালীন ঢালিউডে।
অভিনয়ে তারা এতটাই সাবলীল ছিলেন যে সিনেমার পর্দায় রাজ্জাক-কবরীর প্রেম দেখতে দেখতে প্রেমে পড়তেন দর্শক। অনেকে আবার তাদের এই দুটি প্রিয় জুটিকে বাস্তবের জুটি হিসেবেও চাইতেন।
কিন্তু মজার বিষয় হলো- রাজ্জাক ও কবরী যখন পর্দা কাঁপানো জুটি, তখন তারা দুজনেই বিবাহিত। দুজনেই নিজেদের সংসারের প্রতি ভীষণ দায়বদ্ধ ছিলেন। তবে নায়ক-নায়িকার প্রেম নিয়ে মুখরোচক খবর, সে তো ভীষণ আগ্রহের। আর সেটা যদি হয় সফল জুটির প্রেমের গল্প তবে তা জমে জমজমাট অবস্থা হয়। রাজ্জাক-কবরীর প্রেম নিয়েও এমন গল্প-গুজবের অভাব ছিল না। রাজ্জাক ও কবরী সিনেমার অবিচ্ছেদ্য জুটি যেমন ছিলেন, তেমনি তাদের মধ্য ঝগড়াও লেগে থাকত। এসব নিয়ে মান-অভিমানও নাকি তৈরি হতো।
নিজের ৭৬তম জন্মদিনের প্রারম্ভে ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গুলশানে নিজের বাসভবন ‘রাজলক্ষী’তে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের ছলে কবরীর সঙ্গে ‘প্রেমকথা’ নিয়ে মুখ খুলেছিলেন নায়করাজ। কথায় কথায় বলেছিনে, ‘১৯৬৮ সালে সুভাষ দত্ত আমাকে আর কবরীকে নিয়ে নির্মাণ করলেন “আবির্ভাব” চলচ্চিত্র। প্রথম ছবি দিয়েই বাজিমাত হয়ে গেল। দর্শকের মনে লেগে গেল আমাদের জুটি। তারপর অসংখ্য ছবিতে কাজ করেছি। যেখানেই যেতাম সবখানেই রাজ্জাক-কবরী এক নাম। তোমাদের মা-খালাদের কাছে প্রশ্ন করো যে রাজ্জাক-কবরী সম্পর্কে কিছু বলো। তারা দেখবে ফিসফিস করে বলছে, ওহ বাবা! সে কী প্রেম। আসলে আমার আর কবরীর পর্দার প্রেমটাকে সবাই এতটাই ভালোবেসেছিলেন যে এটাকে তারা বাস্তব মনে করতেন। সবাই আমাদের প্রেমের স্টাইল ফলো করতেন, আমাদের সংলাপ ব্যবহার করতেন, আমাদের গানগুলো গাইতেন।’
স্ক্যান্ডালে বিরক্ত হতেন প্রায়ই। তেমন এক ঘটনার রেশ টেনে রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘একবার কবরীর সঙ্গে দেখা হতেই সে কী রাগ। বললাম ব্যাপার কী। তিনি বললেন, “রাজ্জাক ভাই কোথাও যেতে পারি না। সবাই দেখলেই বলে ওই যে রাজ্জাক-কবরী যায়। আচ্ছা, আমার নাম তো শুধু কবরী। সবাই আগে রাজ্জাক বসায় কেন!” আমি হাসতে হাসতে জবাব দিলাম, দেখুন সবাই আপনাকে মিসেস রাজ্জাক বলতে পছন্দ করে। এটা জুটির সাফল্য। আমার কথা শুনে কবরী তো আরও রেগে গেলেন।’
‘কতো মুখরোচক গল্প ছড়িয়েছে আমাদের দুজনকে নিয়ে। কতো পত্রিকায় কতো গল্প-উপন্যাস। মাঝে মাঝে মন খারাপ করতাম। কবরীও অনেক আপসেট হয়ে যেত। কিন্তু জহির রায়হান সাহেবের একটা কথা আমি সবসময় মনে রেখেছি। সেটি হলো, যতদিন তোমাকে নিয়ে কাগজে গাল-গল্প লেখা আসবে ততোদিন তুমি সুপারস্টার। যেদিন আর কেউ তোমাকে নিয়ে কৌতুহলী হবে না সেদিন তুমি কেউ নয়। তার এই কথাটা ভেবে আমি আর মন খারাপ করিনি কখনো’- যোগ করেছিলেন নায়করাজ।
কবরীও নানা স্মৃতিকথায়, সাক্ষাৎকারে রাজ্জাকের সঙ্গে জুটিকে ক্যারিয়ারের সেরা জুটি আখ্যা দিয়েছেন। রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি তিনিও উপভোগ করতেন।
রাজ্জাক-কবরী; আজ তারা সব স্ক্যান্ডাল, গুজবের ঊর্ধ্বে। দুজনই এখন একই জগতে। তো, আবার না হয় তাদের দেখা হোক, কথা হোক। ভালো থাকা হোক বন্ধুত্ব আর সম্পর্কের রহস্যে।
আলমগীর কবির