ইশতিয়াক আহমেদ, তিনি ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের স্থপতি

রোকেয়া আপা সারাদিন ব্যস্ত ছিলেন নিউ ইয়র্কে এবং তাঁকে সেই সন্ধ্যায়ই ট্রেনে ফিরতে হবে ওয়াশিংটন। যথারীতি আমি আমার পরম শ্রদ্ধেয় আপাকে যখন ম্যানহাটন পেন স্টেশন নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন ইশতিয়াক ভাইকে নিয়ে অনেক গল্প হয় রাস্তায়। আপা ট্রেন ছাড়বার আগেই খুব তিনি সিরিয়াসলি বলিছেলেন, ইশতিয়াক ভাইজানের শরীরটা তেমন ভালো নেই, তুমি সহসা তাঁকে অবশ্যই দেখতে আসবে। পরদিন সকালেই খবর পেলাম আমাদের সবার প্রিয় ভাই সেই রাতেই তিনি পরলোক গমন করেছেন। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সূচনা হয় প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে ইশতিয়াক আহমেদকে নিয়ে। তার আগে, প্রায় ৫০ সালের দিকে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের সংবাদ পড়তেন ইশতিয়াক ভাই। তিনি ভিওএ বাংলা বিভাগের জন্য উপমহাদেশ থেকে সবচেয়ে মেধাবী প্রায় দু’ডজন বেতার সাংবাদিক ওয়াশিংটনে নিয়োগ করেন। পুরো ভয়েস অব আমেরিকায় বাংলা বিভাগটি ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল।
ইশতিয়াক আহমেদ ভাইজান ঢাকা থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে তিনি তাঁর স্ত্রী ফারহাত ভাবীসহ আমেরিকা আসেন। সবাই ভয়েস অব আমেরিকা ফ্যান ক্লাব ফেডারেশন নিয়ে তখন আমাদের কি যে উৎসাহ এবং উদ্দীপনা ছিলো! তখন আমাদের সাথে খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী ভাই ফ্যান ক্লাবগুলোকে উৎসাহ জোগাতেন। একবার আমরা ভাবীসহ ইশতিয়াক ভাইকে নিয়ে দারুন একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিলাম গিয়াস কামাল ভাইয়ের বাসায়। আমাদের ভিওএ ফ্যান ক্লাবের জন্য সেই সন্ধ্যার কথব স্মৃতিময় হয়ে আছে।
ঠিক পরদিনই ইশতিয়াক ভাইয়ের একটা বিশেষ জরুরি কাজ ছিলো ঢাকায়। ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিতে হবে সোনারগাঁ হোটেলে। সেদিন অনেকেই ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। সেদিন ব্যস্ততার মাঝেও ইশতিয়াক ভাইয়ের সাথে তাঁর হোটেল রুমে বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল। ঘটনাক্রমে গিয়াস কামাল ভাইয়ের তখনও ইন্টারভিউ হয়নি। ইশতিয়াক ভাইকে বিশেষ অনুরোধ করেছিলাম এই মানুষটির জন্য। গিয়াস কামাল ভাইয়ের ঊর্ধতন বাসস ( বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ) কর্মকর্তার পাশাপাশি বলেন ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিনিধি হলেন। তখন টেলিফোনে ঢাকা থেকে প্রতিদিন সংবাদ পাঠাতেন।
ঢাকায় তোলা প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের একটি সাদাকালো ছবি পেয়েছি, যা অনেকটা ঐতিহাসিক বটে। আমার স্মরণ ছিলনা যে সেটি তোলেছিলেন ইউসিস-এর ফটোগ্রাফার আব্দুল কাদের। ডান দিক থেকে পর পর দাঁড়িয়ে ছিলেন সরকার কবির উদ্দিন, সৈয়দ আসাদুজ্জামান বাচ্চু ( ইউসিস এর চীফ এডিটর), সাথে আমি, ভাবী ফারহাত আহমেদ ও ইশতিয়াক আহমেদ, তারিক খান ও আমেরিকান কালচারাল সেন্টারের ভিওএ স্টুডিওর দায়িত্বে নিয়োজিত আব্দুল হাই খান।
ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ২০০৯ সালে ওয়াশিংটনে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হন। রোকেয়া হায়দার আপা অফিসিয়ালি আমাকে ছাড়াও ঠিকানার তখনকার সম্পাদক সাইদুর রব, নর্থ আমেরিকা এনটিভির প্রধান সৈয়দ হোসেন, ফটো সাংবাদিক নিহার সিদ্দিকী ও আবির আলমগীর। এই বিশাল অনুষ্ঠানে গিয়ে বহু বছর পরে দেখা হলো প্রিয় ইশতিয়াক ভাইয়ের সাথে । তিনি বেশ ক’বছর আগেই রিটায়ার করেছেন। দেখা হতেই তিনি আমাকে দীর্ঘক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে রাখেন। নিহার ভাই সেদিনের প্রতিটি মুহুর্তের ছবি তুলছিলেন।সেদিন অন্যান্যদের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা হলেন ফারহাত ভাবী, ইকবাল আহমেদ, সৈয়দ জিয়াঊর রহমান, রোকেয়া আপা, সরকার কবির ভাই সহ আরও অনেকে। বাংলা বিভাগের ৫০তম বার্ষিকীর প্রতিটি মুহুর্তের হাজার হাজার ছবি ধারন করেন নিহার সিদ্দিকী। সেটা এক ইতিহাস। ইশতিয়াক ভাই এবং তাঁর ছোট ভাই ইকবাল আহমেদও ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন। সে সময় ইকবাল বাহার চৌধুরী ভাই বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন।
বিশাল ব্যক্তিত্বের কারণে ইশতিয়াক আহমেদ ভাই ভয়েস অব আমেরিকায় একজন আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ভিওএ ডিরেক্টর আর পিটার স্ট্রাউস ইসতিয়াক ভাইকে ‘এক্সট্রা লিডারশিপ’ সন্মাননায় সম্মানীত করেছেন। সেই বিশেষ মুহূর্তে পাশে ছিলেন নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান অ্যালেন বেকার। ইশতিয়াক ভাইয়ের স্ত্রী ফারহাত আহমেদও উপস্থিত ছিলেন। ইশতিয়াক আহমেদ ভিওএ বাংলা বিভাগে ১৯৫৮ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে একটানা কাজ করে গেছেন।এর মধ্যে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্য্ন্ত দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাংলা বিভাগের দায়িত্ব শেষে তাঁরই সহোদর এবং কৃতি ইকবাল আহমেদ ভাই প্রধান হন।
ভয়েস অব আমেরিকার ৬০ বছরপুর্তি হলে অত্যন্ত জমজমাট অনুষ্ঠান আয়োজন হয় যেখানে ভয়েস অব আমেরিকার বর্তমান ও প্রাক্তন অনেকেই যোগ দেন। ইশতিয়াক আহমেদের স্ত্রী ফারহাত আহমেদ, শরীর তেমন ভালো না থাকলেও এসেছিলেন ইকবাল আহমেদ। আর যাঁরা সেদিন যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন কাফি খান, সৈয়দ জিয়াউর রহমান, ইকবাল বাহার চৌধুরী, দিলারা হাশেম, মাসুমা খাতুন, রোকেয়া হায়দার, সরকার কবির উদ্দিন, শেগুফতা নাসরিন কুইন, আহসানুল হক, তাহিরা কিবরিয়া, ফকির সেলিম, তাওহিদুল ইসলাম, সাবরিনা চৌধুরী ডোনা, ইজাজ বিন হিউসেন, ওয়াহেদ আল হোসেনী,সরকার কবির ভাইয়ের স্ত্রী ভাবী নিশাত কবির এবং আরও অনেকে। এই ছবিটি নিহার সিদ্দিকী সহ নিউ ইয়র্ক সহ অতিথিদের আমার তোলা গ্রুপ ছবি।
নিহার সিদ্দিকী ভাই ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের ৫০ বছরপুর্তি অনুষ্ঠানের হাজার হাজার ছবি তুলেছেন। কিন্তু আমার ভীষণ প্রিয় মানুষ ইশতিয়াক ভাইকে মাত্র কিছু ছবিতে দেখতে পাই। বছরের পর বছর ছবিগুলো কোন না কোন কারণে কারও চোখেই পড়লোনা। সেদিন অনেকটা দৈবাৎ যেন সেগুলো খুঁজে পাই আমাদের সম্প্রতি প্রয়াত সৈয়দ জিয়াউর রহমান ভাইজানের ফেসবুকে।
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ইশতিয়াক ভাইয়ের হঠাৎ চিরবিদায় নেওয়ার কারণে তাঁর সাথে জীবদ্দশায় আমার আর শেষ দেখা হলো না। অথচ তাঁর কর্মবহুল বর্ণাঢ্য জীবনের স্মৃতি নিয়ে কতো কথা বলার ও জানার ছিলো। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সময় করে এই সুযোগটি না নেওয়ার আফসোস আমাকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে।
আকবর হায়দার কিরন