৬৮ বছরে ভাষা আন্দোলন নিয়ে মাত্র ৩টি চলচ্চিত্র

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে বলা হয়ে থাকে ১৯৭১ সালে গৌরবময় বিজয় অর্জনের মূল সূত্র। প্রথমে রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং পরে সার্বভৌমত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে আজকের মাথা উঁচু বাংলাদেশ। এর চেয়েও উল্লেখযোগ্য বিষয়– ভাষার জন্য এমন রক্তক্ষয় কিংবা আন্দোলনের নজির পৃথিবীতে আর ঘটেনি একটিও। বছর ঘুরে একুশে ফেব্রুয়ারি সেই বার্তা নিয়ে হাজির হয় বিশ্ববাসীর নজরে। কারণ দিনটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।
অথচ এমন দিনে (২১ ফেব্রুয়ারি) কিংবা ভাষার মাসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে না কোনও চলচ্চিত্র! ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামের একটি বিশেষ ছবি ২১ ফেব্রুয়ারি মুক্তির কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তা হয়নি। ছবিটিতে নায়ক চরিত্রে আছেন সংগীতশিল্পী এসডি রুবেল। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছে ছিল ছবিটি বিশেষ এই দিনে মুক্তি দেওয়ার। এজন্য বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমরা সরে এসেছি। ছবিটি মুক্তি দিতে আরেকটু সময় লাগবে।’
এদিকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচার হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি বিশেষ নাটক। প্রকাশের তথ্য মেলেনি নতুন কোনও গান কিংবা মিউজিক ভিডিওর। অথচ গেলো সপ্তাহে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে বাংলাদেশের নাটক-সিনেমা আর গানের বাজারে তৈরি হলো মল্লযুদ্ধ! যার রেশ রয়েছে এখনও। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শতাধিক নাটক, মিউজিক ভিডিওর সঙ্গে মুক্তির মিছিলে ছিল হাফ ডজন বাংলা সিনেমা। যদিও শেষ পর্যন্ত শাকিব খানের ‘বীর’-এর দাপটে অন্য ছবিগুলো পিছিয়ে যায়। সেই হিসেবে গেলো সপ্তাহের মতো একুশে ফেব্রুয়ারিতেও দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলবে ‘বীর’। স্বস্তি এটুকুই ‘বীর’-এর চিত্রনাট্য বাংলা ভাষায় লেখা! এর বাইরে একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে এর কোনও সম্পৃক্ততা নেই।
বিপরীতে এবারের মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে দেশে মুক্তি পাচ্ছে ইংরেজি ভাষার দুটি নতুন চলচ্চিত্র। ‘দ্য কল অব দ্য ওয়াইল্ড’ ও ‘ব্রামস: দ্য বয় টু’ নামে হলিউডের ছবি দুটি নিয়ে এসেছে ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স। না, এ দুটি ছবির গল্প ‘ভাষা’ নিয়ে রচিত হয়নি। এর একটি ভৌতিক, দুঃসাহসিক অভিযাত্রা নিয়ে অন্যটি।
স্টার সিনেপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ বিপণন ব্যবস্থাপক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক সূচি অনুযায়ী হলিউডের নতুন দুটি ছবি এদিন (২১ ফেব্রুয়ারি) মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কারণ এ বিষয়ে অনেক আগেই তারা চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। যার পেছনে অন্য কোনও ‘কিন্তু’ নেই।
মেজবাহ বলেন, ‘‘আপনারা জানেন, আমরা বরাবরই ভালো ছবির জন্য কাজ করে আসছি। আমরা যে শুধু বিদেশি সিনেমা আমদানি করি, তা নয়। এর মধ্যে বাংলা ছবি নির্মাণেও নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছি। ‘ন ডরাই’ তারই প্রমাণ। আমরা চাই আমাদের সিনেমা আরও এগিয়ে যাক, সেই যাত্রায় আমাদের অংশগ্রহণ বরাবরই আছে, থাকবে।”
একুশে ফেব্রুয়ারিতে হলিউডের দুটি ছবি মুক্তি দিলেও এদিন সর্বোচ্চ চারটি বাংলা সিনেমা থাকছে স্টার সিনেপ্লেক্সের রূপালি পর্দায়। এর মধ্যে রয়েছে ফাখরুল আরেফিন খানের ‘গণ্ডি’, তানিম রহমান অংশুর ‘ন ডরাই’ কাজী হায়াতের ‘বীর’ এবং নিয়ামুল মুক্তার ‘কাঠবিড়ালী’।
যদিও এই ছবিগুলো বাংলাদেশের হলেও এর মধ্যে ভাষা আন্দোলনের কোনও সংযোগ নেই। বোদ্ধাদের অভিমত, ভাষার সঙ্গে সংযোগ আছে এমন ছবিগুলোকে এই দিনে (২১ ফেব্রুয়ারি) বা এই সপ্তাহে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেওয়া হলে ইতিবাচক ব্যাপার ঘটতো।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘মাতৃভাষা দিবসে বাংলা কোনও ছবি মুক্তি পাচ্ছে না। এটা হতাশার খবর। আরও দুঃখজনক বিষয়, এই দিনে ভিন্ন ভাষার দুটি ছবি মুক্তি পাচ্ছে। এগুলো নিয়ে আসলে ভাববার অবকাশ রয়েছে।’
এদিকে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সবশেষ ছবি বানিয়েছেন অভিনেতা-নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নামের ছবিটি ভালোই প্রশংসা কুড়িয়ে চলছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎসবে। এ ধরনের ছবি কম হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, ‘দেশে মুক্তি দেওয়ার মতো ছবি না থাকলে তো বিদেশি ছবিই আসবে। সিনেমা হল তো ফাঁকা থাকবে না। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছবি নির্মাণ করা বেশ ব্যয়বহুল আর সময়সাপেক্ষ বিষয়। এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের সার্বিক অবস্থাই আসলে নাজুক।’
তৌকীর আরও বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি দুটো মাধ্যমেরই চলচ্চিত্র শিল্পটার দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। আমাদের বোঝা দরকার, শুধু সিনেপ্লেক্স বানালেই হবে না। সবশ্রেণির মানুষকে ছবি দেখার সুযোগটা তৈরি করে দিতে হবে। কারণ, ৪০০-৬০০ টাকায় টিকিট কেটে তো দেশের সব মানুষ ছবি দেখার ক্ষমতা রাখে না। আবার কনটেন্ট নিয়ে ভাবারও সময় এসেছে। চলচ্চিত্রের সামগ্রিক জটিলতা না ছুটলে বিশেষ ছবি তৈরি হওয়ার আশা করা ভুল হবে।’
চলচ্চিত্র তথ্যভাণ্ডার বলছে, ১৯৫২ সালের পর ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলাদেশে মাত্র তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে! যার প্রথমটি ১৯৭০ সালে পরিচালনা করেন জহির রায়হান, নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই ছবিটি বানিয়েছিলেন তিনি। যে ছবি শুধু কালজয়ী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, স্বাধীনতা সংগ্রামেও ব্যাপক অবদান রেখেছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও ভাষা আন্দোলনকে প্রাধান্য দিয়ে শহীদুল ইসলাম খোকন ২০০৬ সালে নির্মাণ করেন ‘বাঙলা’। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘ওংকার’ উপন্যাসে অনুপ্রাণিত এটি। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মিত হয় ‘বাঙলা’। হুমায়ুন ফরীদি, মাহফুজ আহমেদ, শাবনূর অভিনীত এ ছবির শেষ দৃশ্যে একজন বোবা মেয়ের মুখ থেকে বের হয়ে আসে একটি শব্দ– ‘বাঙলা’।
আলমগীর কবির