নিউইয়র্কে বেবী নাজনীন’র আলোচিত গজল সন্ধ্যা

কৃষ্ণহীরক কিংবা ব্লাক ডায়মন্ড এই উপাধী গুলো শুনলেই বোঝা যায় কথা হচ্ছে বেবী নাজনীনকে ঘিরে। গত সপ্তাহে আমেরিকায় হয়ে গেল তার একক গজল সন্ধ্যা। বাংলাদেশের কোন সঙ্গীত তারকাকে ঘিরে বিদেশের মাটিতে এমন ভিন্নমাত্রার সাহসী আয়োজন এবারই প্রথম। প্রবাসী শ্রোতা-দর্শকদের মাতিয়েও দিয়েছেন তিনি। ১০০ ডলারে টিকিট কেটে অনুষ্ঠানে সমাগম ঘটে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের দর্শক-শ্রোতার। বেবী নাজনীন, বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত সঙ্গীত তারকা। আধুনিক বাংলা গানের বাজারে রয়েছে যার সর্বাধিক সংখ্যক একক এবং মিশ্র এ্যালবাম। বাংলাদেশ বেতার, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং মঞ্চ মাধ্যমের অপ্রতিদ্বন্দী এবং লক্ষ শ্রোতার হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারকারী একজন গানের শিল্পী তিনি। ‘বø্যাক ডায়মন্ড’ নামে যার খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ ছাড়িয়ে উপমহাদেশ এবং বিদেশেও। গানের মাধ্যমে সরকারী এবং বেসরকারী ভাবে পৃথিবীর বহু দেশে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন বহু বছর ধরে। যে কারণে বিভিন্ন ভাষার গানই তাকে রপ্ত করতে হয়েছে। এক কথায় একজন বহুমাত্রিক গানের শিল্পী তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন একাধিকবার, দেশ এবং বিদেশের অনেক সন্মান-সন্মাননা অর্জন করেছেন তার সঙ্গীত জীবনে। আধুনিক গানের বাইরে রবীন্দ্র-নজরুল, লালন, পল্লী, ভাওয়াইয়া গানের ব্যাপক দখল রয়েছে তার। হিন্দী- উর্দু গান আর গজলেও সমান শক্তিমান এক কণ্ঠ বেবী নাজনীন। দেশ এবং বিদেশের বিভিন্ন স্টেইজে সেইসব গুণের সাক্ষরও তিনি রেখেছেন তার চল্লিশ বছরের সঙ্গীত জীবনে। আসলে একজন প্রকৃত শিল্পীকে সব ঘরানার গানেই পারদর্শী হতে হয়। বাংলাদেশের হাতে গোনা যে দুই তিনজন সঙ্গীতশিল্পী গানের বিভিন্ন ধারায় বিচরণ করে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন বেবী নাজনীন তাদের প্রধানতম একজন। ভার্সেটাইল গানের এই সিঙ্গার বলেন, ‘আসলে কোন গান কোথায় গাইবো এটা নির্ভর করে কোন ধরণের গানের শ্রোতার সামনে আমি উপস্থিত রয়েছি। নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করতে এবং রাখতে হয়। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা হল মঞ্চ। এটি একটি কঠিন জায়গা। যেখানে বিভিন্ন রকমের মানুষের সমাগম ঘটে। তাদের রুচীও হয় বিভিন্ন রকম। নানা রকমের গানের অনুরোধ আসবে, তখন যদি আপনি নিজেকে সেই রুচী অনুযায়ী উপস্থাপন করতে না পারেন তাহলে দর্শক শ্রোতার কাছে আপনার আলাদা কোন অবস্থান তৈরি হবে না। অথচ এই অবস্থানটিই আপনাকে শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বেশী এগিয়ে নেবে। গান গাইতে হলে বিভিন্ন ধারার গানের সঠিক চর্চা থাকতে হবে অবশ্যই।’ নতুন বছরের শুরুতেই ৪ জানুয়ারী ২০২০ সুদূর আমেরিকার নিউ ইয়র্কে হয়ে গেল বেবী নাজনীনের একক গজল সন্ধ্যা ‘সাম ই গজল’। বাংলাদেশী কোন সঙ্গীত শিল্পীকে ঘিরে বিদেশের মাটিতে এমন ভিন্নমাত্রার আয়োজন এবারই প্রথম। অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ উপস্থিতি ঘটে ভারত-পাকিস্তান এবং অন্যদেশের সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের। একটানা তিন ঘন্টা পারফর্ম করেন বেবী নাজনীন। উর্দু-হিন্দী মিলিয়ে প্রয় ৩০টি গজল পরিবেশন করেন নিউ ইয়র্ক জ্যাকসন হাইটস এর বেলোজিনো মিলনায়তনে। নিউ ইয়র্কের আকাশে সেদিন একটু শীত বৃষ্টির হলেও ক্লাসিক দর্শকদের সমাগমে বেশ জমে উঠে বেবীর গজল সন্ধ্যা। বাংলাদেশের মিডিয়াতেও বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলে। বিশেষ এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন শো টাইম মিউজিক এবং এর কর্ণধার আলমগীর খান আলম। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা বেবীর গানের হাতে খড়ি তার বাবা সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব মনসুর সরকারের কাছে। তারপর জীবনের দীর্ঘ চলারপথে সঙ্গীতের নানা দীক্ষা এবং সাধনায় যেন নিজেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন বেবী নাজনীন। আর সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে বেবী নাজনীনকে একজন ‘সেলফ মেইড’ সঙ্গীত তারকা বলা যায়। ঐ রংধনু থেকে, কাল সারা রাত ছিলো স্বপনেরও রাত, এলো মেলো বাতাসে উড়িয়েছি শাড়ির আঁচল, দু চোখে ঘুম আসে না তোমাকে দেখার পর, আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলোরে মরার কোকিলে, মানুষ নিষ্পাপ পৃথিবিতে আসে, কই গেলা নিঠুর বন্ধুরে-সারা বাংলা খুঁজি তোমারে, পূবালী বাতাসে, ও বন্ধু তুমি কই কই রে.. এমন অনেক কালজয়ী গানের শিল্পী বেবী নাজনীন লেখক হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছেন। তার নিজের অনেক গান তিনি নিজেই লিখেছেন, সুরারোপও করেছেন। তার লেখা ‘সে,’ ঠোঁটে ভালবাসা.’ এবং ‘প্রিয়মুখ’ শিরোনামে তিনটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে বইয়ের বাজারে। এখন লেখালেখির তেমন একটা সময় পাননা বলে ব্যক্ত করেন তিনি। দেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বেবী নাজনীন বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিব আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ সম্পাদক। রাজনৈতিক কারণেই দেশের চেয়ে বিদেশের অনুষ্ঠানে তাকে দেখা যায় বেশী। গত ২০ ডিসেম্বর ক্যান্সারে আক্রান্ত দেশের আরেক জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী এ্যান্ড্রু কিশোরের চিকিৎসা সহায়তায় উদ্দেশ্যে আমেরিকার কুইন্স প্যালেসে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে বেবী নাজনীনই ছিলেন একমাত্র আকর্ষণ। মাত্র ১০ দিনে আগেই কানাডার কনসার্ট শেষ করে ফিরে গেলেন আমেরিকায়। চলতি বছরের শুরুতেই আমেরিকার আরো কয়েকটি স্টেটে কনসার্ট রয়েছে তার। সেগুলো সফল ভাবে শেষ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বেবী নাজনীন বলেন, ‘রাজনীতির মত বাংলাদেশের সংস্কৃতিও যেনো দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আমরা যার বিএনপির সঙ্গে যুক্ত তারা বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশে একটু কোন ঠাসা অবস্থায় আছি। গান আমার পেশা। আমি চাকুরী বা ব্যবসা করিনা। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। বিদেশের মাটিতে দেশী রাজনীতির খেলা তেমন চলে না। যে কারণে আমি বিদেশের অনুষ্ঠান নিয়েই আপাতত ব্যস্ত আছি। আজ আমেরিকা তো কাল কানাডা, লন্ডন, প্যারিস অস্ট্রেলিয়া, দুবাই-বাংলাদেশের মত এইসব দেশেও আমার গানের ভক্ত শ্রোতা রয়েছে লাখ লাখ। তাদের জন্যই দেশ ছেড়ে বিদেশে একটু বেশী সময় থাকতে হয়। আমেরিকার শো গুলো শেষ করেই দেশে ফিরবো। বেশ কিছু নতুন গান আমার রেকর্ড় হয়ে আছে, রিলিজ করা হয়নি। গান গুলো ছেড়ে দেবো। আরো কিছু গান হাফ ডান হয়ে আছে সেই সবও শেষ করতে হবে।’ এই সময়ের সংস্কৃতি অঙ্গন নিয়েও কথা বলেছেন তিনি, ‘বললেন আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। খুবই দুঃখের বিষয় যে ঐতিহ্য নিয়ে গত কয়েক দশকে এগিয়েছে আমাদের অডিও ইন্ডাস্ট্রি এবং চলচ্চিত্র সঙ্গীত সেই ধারায় এখন আর তা নেই। প্রযুক্তির কারণে সংস্কৃতি বাজারজাতের ধারা হয়ত বদলেছে কিন্তু সেই ভাবে উঠে আসতে পারছেনা আগামী দিনের শিল্পী এবং সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে এখন পেশা হিসেবে নেয়ার সাহসও করা যায় না। কারণ এই মাধ্যমে এখন নতুন বিনিয়োগ নেই, নেই সুযোগ এবং পৃষ্ঠোপোষকতা। একটা দুইটা গান বা সিঙ্গেল ট্র্যাকের মাধ্যমে নিজেদের চেষ্টায় কেউ কেউ হয়ত যুক্ত হচ্ছেন গানের বাজারে কিন্তু এভাবে কত দূর যাওয়া যায়? মেধা বিকাশের কোন প্লাটফর্ম নেই। সঙ্গীতে যারা নিজের ভাগ্য গড়তে চান তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকা দেখা দিচ্ছে। এই ধারার পরিবর্তন হওয়া জরুরী। চলািচ্চত্র মাধ্যমের অবস্থায়ও বলতে গেলে একই রকম। যারা সিনেমা প্রযোজনা করতেন তারা সরে গেছেন চলচ্চিত্র শিল্প থেকে। শুনেছি হাতে গোনা দুই দিনজন নায়ক-নায়িকা রয়েছেন যারা নিজেরা বিনিয়োগ করে সিনেমা বানাচ্ছেন। তারই বা কতদিন বিনিয়োগ করবেন? এভাবে কি একটা শিল্প সমৃদ্ধ ইন্ডাষ্ট্রি দাড়াঁতে পারে?’
আলমগীর কবির