নিউজ ম্যাগাজিনের সফল রূপকার শাহাদাত চৌধুরী

শাহাদাত চৌধুরী মারা গেছেন ৬২ বছর বয়সে ২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর। বেঁচে থাকলে তার বয়স ৭৫ পেরিয়ে যেত আজ ২৮ জুলাই। তিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৩ সালে। কিছুকাল আগে এক সুপার শপে দেখা হয় ভাবি ও শাশার সঙ্গে। শাশা শাহাদাত ভাইয়ের বড় মেয়ে। কুশল বিনিময় হল। শাহাদাত ভাইকে নিয়ে কোনো কথা হল না। কী-ই বা আর বলার আছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যে মানুষটির নেতৃত্বে সাপ্তাহিক পত্রিকার জগতে মাইলফলক তৈরি হলো তার জন্য বড় উদ্যোগ নিয়ে তো কিছু হল না। নিয়মমাফিক একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সেটি পূর্ণাঙ্গ শাহাদাত চৌধুরীকে তুলে ধরতে পারেনি।

১৯৭০ দশকেই তার জুনিয়র বন্ধুরা তাকে ‘বুড়া’ সম্বোধন করতেন, তাতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। তবে মজা করে বলতেন, তোমাদের তুলনায় বুড়া- কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু বুড্ডা হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। তার প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে এক অর্থে। বয়সের মানদন্ডে অনেকটা তরুন হিসেবেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কেবল অসুখ কিছুটা কাবু করে দিয়েছিল শেষ দিকে। থাইরয়েড’র সমস্যায় মোটা হয়ে গিয়েছিলেন বলে অনেককেই সাক্ষাৎ করতে মানা করতেন, বলতেন, ‘সেই শাহাদাত এখন আর নেই।’

সাপ্তাহিক বিচিত্রার কথা ৭০ দশকে যারা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন তারা অনেকটাই জানেন। আমি ১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত সময়ের বিচিত্রার কথা বলছি। প্রথম দিন থেকে একেবারে শেষ দিন ৩১ অক্টোবর ১৯৯৭ পর্যন্ত কাজ করেছি এই প্রতিষ্ঠানে। বাংলা ভাষায় সাপ্তাহিক বিচিত্রা-ই বোধহয় প্রথম সফল নিউজ ম্যাগাজিন। বিচিত্রার সাফল্যের একটি বড় কারণ টিমওয়র্ক এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব। শাহাদাত ভাই প্রথমে ছিলেন সহকারী সম্পাদক, ফজল শাহাবুদ্দীনের তত্বাবধানে। সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন ১৯৮৫ সালে ।

সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১৯৭২ সালে একসঙ্গে কাজ শুরু করলেও শাহাদাত চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় আরো আগে। সে পরিচয়-ও কর্মসুত্রে। ১৯৭০ সালে পাক্ষিক চিত্রিতায় প্রথম পরিচয় ও সহকর্মী হওয়া। সম্পাদক ছিলেন লায়লা সামাদ। তার পক্ষে সামগ্রিক দেখাশুনা করতেন ফজল শাহাবুদ্দীন। ফজল ভাই একদিন সন্ধ্যায় শাহাদত ভাইকে নিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন এখন থেকে শাহাদাত চৌধুরী হবেন সহকারী সম্পাদক। তখনও ঐ পদে কেউ ছিলেন না। সম্পাদনা সহকারী ও প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছিলাম আমরা। ছিলাম শেখ আবদুর রহমান, আহমেদ নূরে আলম, মাহফুজউল্লাহ এবং চিত্রগ্রাহক একরামউল্লাহ। অল্পদিনের মধ্যেই তিনিও এই দলের একজন হয়ে গেলেন। চিত্রিতার পাতায়ও তিনি তার চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করেন। একটা সুবিধা তার ছিল। আমরা এখানে আগে এলেও বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় শেখ আবদুর রহমান ছাড়া সবাই ছিলাম তার জুনিয়র। এতে ‘কম্যান্ডিং অফিসার’ হতে বেগ পেতে হয়নি তাকে। আমরা খুব সহজে তাকে আমাদের টিম লিডার হিসেবে গ্রহণ করে নিলাম।

শুরু থেকেই বিচিত্রার রম্য চরিত্র বদলে সমাজচিন্তা বিষয়ক প্রকাশনা করার কথা বলতেন শাহাদাত ভাই। তার চিন্তাধারায় ছিল টাইম-নিউজউইক। বিচিত্রার একটা বড় কৃতিত্ব বাংলা পত্রিকায় প্রচছদ কাহিনীর প্রবর্তন। ১৯৭২ সালে এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ১৯৭৪ থেকে বিচিত্রার প্রচ্ছদ কাহিনী সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ততদিনে বিচিত্রা আর রম্য পত্রিকা নেই। হয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর সাপ্তাহিক প্রকাশনা।

টাইম-নিউজউইক বছর শেষে জাতীয় আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে কাউকে ম্যান অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত করে যুক্তির মাধ্যমে এই নির্বাচনের যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত করতো। বিচিত্রায় আমরা বললাম ‘বছরের আলোচিত চরিত্র’। বাংলা সংবাদপত্র ও সাময়িকির ইতিহাসে সম্ভবত এই পদক্ষেপ ছিল প্রথম। পরে এই প্রক্রিয়া অনেকে অনুসরন করলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে বিচিত্রার নির্বাচিত ‘বছরের আলোচিত চরিত্র’ ছিল সর্বজনগ্রাহ্য। সারা বছরের নানা ক্ষেত্রের মূল্যায়ণ নির্ভর বর্ষপত্র সাময়িকির জগতে বিচিত্রার আর একটি নতুন সংযোজন। এই বর্ষপত্রের সূচিতে ছিল রাজনিতি, অর্থনিতি, সমাজ, কূটনীতি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, চলচিচত্র, ফ্যাশন, গ্রন্থ, খেলাধুলা, আবহাওয়া, চিত্রকলা, আলোকচিত্র। অর্থাৎ সচেতন জীবনধারার সকল উপাদান অন্তর্ভুক্ত ছিল এতে। অনেক পরে কেউ কেউ বর্ষপত্র প্রকাশ করলেও মূল্যায়নের দুর্বলতায় গুরূত্বপুর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনি।

বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের জীবনযাপনে আধুনিকতার উন্মেষ ঘটাতে বিচিত্রার ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা এক নিরব বিপ্লবের মতো। একইসঙ্গে দেশিয় বস্ত্রশিল্পের বিকাশেও এই প্রতিযোগিতা বড় ধরনের অবদান রেখেছে। আজকের নাটক স্মরণি অর্থাৎ সাবেক বেইলি রোডের শাড়ির দোকানের সমারোহ এই প্রতিযোগিতারই শুভ ফলাফল। এইসব নতুন নতুন পদক্ষেপ শাহাদাত চৌধুরীর নেতৃত্বে বিচিত্রার কর্মিরা নিরলস প্রচেষ্টায় সফল করে তুলেছেন। স¤পাদক হিসেবে শাহাদাত ভাইয়ের বড় কৃতিত্ব ছিল দায়িত্ব বন্টনে যথার্থতা। তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন কাকে দিয়ে কোন কাজটি সফলভাবে করানো যাবে। একজন সফল স¤পাদকের অন্যতম প্রধান গুন এই জহুরি চেনা।

বিজ্ঞাপন প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞাপনদাতাদের ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দেয়া হয়নি। ‘বিষন্নতা একটি রোগ’ এমন শ্লোগান দিয়ে ফাইসন্স ওষুধের বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু করলে আমরা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে। ফাইসন্স বিচিত্রার নিয়মিত বিজ্ঞাপনদাতাদের একজন ছিল। আমরা আমাদের সেই স্বার্থের কথা না ভেবে সামাজিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম সেদিন। আমরা চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের মতামত ও গবেষণা উদ্ধৃত করে প্রমান করেছিলাম বিষন্নতা কোন রোগ নয়, মানুষের এই অবস্থা ওষুধ দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। সাধারণ মানুষকে ব্যবসার স্বার্থে এই পদ্ধতিতে ঠকানো অন্যায়, সেই কথাই আমরা প্রচছদ প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিলাম। শাহাদাত ভাই প্রভাবশালিদের প্রবল চাপ সত্বেও সঠিক অবস্থান থেকে এতটুকু সরেননি।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি আসর মাত করা মানুষ হলেও নিজস্ব গন্ডির মধ্যেই থাকতে ভালবাসতেন। আসরের খোঁজ পেলেই উতলা হতেন না। অফিসের বাইরে তিনি নিজের বাসা এবং নির্দিষ্ট বন্ধুদের আডডা ছাড়া সচরাচর অন্য কোথাও যেতে চাইতেন না। তাই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য হলেও ঠিক ক্লাবমুখী ছিলেন না। তবে সিনিয়র জুনিয়র অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। তিনি তার বাসায় বরং সমাবেশ ডেকে নানান শ্রোতের চিন্তাবিদদের জড়ো করতেন। একটি বিকল্প ক্লাবের মত ছিল এসব সমাবেশ। ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে প্রায় ১৫ বছর এই ধারা অব্যাহত ছিল। এর মাধ্যমে বিচিত্রার একটা সোশ্যাল মার্কেটিংও হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা বিষয়ভিত্তিক যে গোলটেবিল বৈঠক করে বিচিত্রায় এরকম অনেক সমাবেশ ছিল ঐ বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। সেই আলোচনার নির্যাস নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক প্রচ্ছদ কাহিনী। এখন পত্রিকার গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনার বিবরণ প্রকাশ করা হয়। বিচিত্রা বক্তাদের মতামত প্রকাশ করে, মতামতের সূত্র ধরে নতুন প্রেক্ষিত তৈরি করার চেষ্টা করতো।

ভাবি আর শাশার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় মনে পড়ল শাশার জন্ম হওয়ার পর কি খুশি-ই না হয়েছিলেন শাহাদাত ভাই। পার্টি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এমনকি বিচিত্রার কাজে-ও কিছুদিন সময় কম দিয়েছিলেন। আমাদের কাছে একটু অবাক লেগেছে। কিন্তু পিতার খুশি হওয়ার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হয় যেদিন আমি পিতা হয়েছিলাম।

সেই শাশা এখন বড় হয়েছে। সন্তানের জন্ম মা-বাবার জন্য যে কেমন আনন্দদায়ক শাশা-ও এখন তা বুঝতে পারে। আমরা জানি প্রিয়জনরা আমাদের ছেড়ে চলে যান, তাদের জন্য আমরা শোকাহত হই। কিছুদিন পর আস্তে আস্তে আবার জড়িয়ে পরি নিজের কাজে। মনের কোনে বেদনা নিয়েই আমরা স্বাভাবিক হই। সেলিনা ভাবি আর শাশার চলে যাওয়া দেখে শাহাদাত ভাইয়ের একটি কথা মনে পড়ল। এক দুপুরে বিচিত্রা অফিসে এই মৃত্যু আর স্বাভাবিকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এটাই হয়ত পৃথিবীর সৌন্দর্য-কোনো কিছু থেমে থাকে না।’

চিন্ময় মুৎসুদ্দী: সাংবাদিক গ্রন্থকার