নাটক-সিনেমার সংশ্লিষ্টদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই : সালাহ্ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী

আর মাত্র দু’বছরের মধ্যেই নাটক ও চলচ্চিত্র ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউব চ্যানেল নির্ভর হতে যাচ্ছে। ইন্টারনেট খুঁজলেই দেখা যায় এরই মাঝে পাশের দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমশ ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা বাড়ছে এবং এগুলোর অধিকাংশ ব্যবসায়িকভাবে সফলও হচ্ছে। ইউটিউব চ্যানেল, যেগুলোতে নাটক, ওয়েব সিরিজ এবং সিনেমা আপলোড হয় সেগুলোও ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং সময় কাটিয়ে সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। আর বাংলা কনটেন্টের চাহিদা তো বাড়ছেই হুহু করে। কারণ, সারা বিশ্বে বর্তমানে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকের সংখ্যাটা প্রায় এগারো কোটি আর বাঙ্গালীর সংখ্যা ২৭ কোটির বেশী। বিশ্বে বর্তমানে বাংলা ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠীর অবস্থান সাত নম্বরে। তারমানে আসলেই বাংলা নাটক ও সিনেমার ভবিষ্যত ভীষণ উজ্জ্বল। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয় আমাদের এক্ষুনি ভাবতে হবে। এখন অব্দি টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা ইউটিউব চ্যানেলে চলা নাটক, টেলিফিল্ম কিংবা ওয়েব সিরিজ নির্মিত হচ্ছে low-end ক্যামেরায়। সম্পাদনা কিংবা কালার গ্রেডিংয়ের কাজ হচ্ছে সস্তা যন্ত্রপাতি দিয়েই। পাশাপাশি সাউন্ডের বিষয়টা এখনও আমরা কতোটা গুরুত্ব দিচ্ছি এটা সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন। কিন্তু বাংলা নাটক ও সিনেমার জন্যে আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি ও সম্প্রসারণের জন্যে কিছু বিষয় আমাদের এখন থেকেই ভাবতে হবে। ওগুলোর জন্যে নির্মিত কন্টেন্ট অবশ্যই ARRI কিংবা RED ক্যামেরায় ধারণ করার পাশাপশি আমাদেরকে একদম প্রফেশনাল ও আধুনিক এডিটিং প্যানেল, কালার গ্রেডিং ইত্যাদির জন্যে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। লাগবে ডিজিট্যাল ডাবিং ষ্টুডিও এবং থ্রি ডি মেকআপের ব্যাবস্থা। আরো লাগবে প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান। গল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্ক হতে হবে আমাদের। নকল, পাইরেটেড কিংবা প্ল্যাগরাইজ্ড গল্প চলবেনা একদম। লাগবে মৌলিক গল্প। পাশাপাশি, ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে এরই মাঝে ব্যবসা সফল কোনো বিদেশী ভাষার ওয়েব সিরিজের গল্প, যেগুলো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সাফল্য পেয়েছে, সেগুলো বাংলা ভাষায় নির্মাণ করা যেতে পারে। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে হিন্দী ভাষায় নতুন একটা ওয়েব সিরিজ মুক্তি পেলো। নাম ‘কল মাই এজেন্ট’ এর আগে এটি ফরাসী ভাষায় নির্মিত হয় এবং ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে। ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের এখানেও একইভাবে বিদেশী ভাষায় নির্মিত ওয়েব সিরিজ বাংলা ভাষায় নির্মিত হবে গল্পের স্বত্ব কিনে নিয়ে। সেটা হোক। কিন্তু তাই বলে শুধুমাত্র বিদেশী গল্পের পেছনে যেনো আমরা না ছুটি। বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের জন্যে যখন বিশাল সম্ভাবনা আসন্ন তখন আমি একটা বিষয়ে কিছু বলবো। বেশ ক’বছর থেকে লক্ষ্য করছি আমাদের এখানকার টিভি চ্যানেলগুলোয় বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিজ চালানোর প্রতিযোগীতা চলছে। এটা অবশ্যই আমাদের নাটক সেক্টরের জন্যে বিশেষ করে সরাসরি হুমকি। টেলিভিশন চ্যানেলে বিদেশী সিরিয়াল চালানো বন্ধের বিষয়ে এরই মাঝে সরকার সিদ্ধান্ত নিলেও সেটা কার্যকর হতে দেখছিনা। আশাকরি এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই সোচ্চার হবেন। এবার আসবো আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্যে নির্মীয়মান চলচ্চিত্র কিংবা ওয়েব সিরিজের নির্মাতা ও আর্টিস্ট প্রসঙ্গে। বিনয়ের সাথেই বলছি, আমাদের এখানে তরুণ নির্মাতাদের মাঝে কাজের ব্যাপারে মনোযোগ, আগ্রহ, সৃষ্টিশীলতা, ধৈর্য এবং ওনাদের নির্মাণ শৈলী চোখে পড়ার মতো। এরা সুযোগ পেলে তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো সিনেমা কিংবা ওয়েব সিরিজ নির্মাণের যোগ্যতা রাখেন। একইভাবে, আর্টিস্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আমাদের শুধুমাত্র তারকা নির্ভর না হয়ে নতুনদের ব্যাপকভাবে সুযোগ দিতে হবে। আমাদের এখানে বহু ছেলেমেয়ে আছে যাদের ভেতর কাজের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ আর একাগ্রতা দেখা যায়। ওদেরকে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে। উৎসাহ ও সাহস যোগাতে হবে। পাশাপাশি দরকার ওরিয়েন্টেশন। তবে যেসব ছেলেমেয়ে একটা আধটা কথিত শর্টফিল্ম কিংবা মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেই নিজেদের নায়ক-নায়িকা ভাবতে শুরু করে ওদের বিষয়ে আমি এটুকুই বলবো, নায়ক-নায়িকা এতো সামান্য বিষয় নয়। আর স্টার হওয়া তো অনেক বড় ব্যাপার। এটা যদি ওরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় তাহলে টিকে থাকবে। আর তা না হলে এক সময় ওরা হারিয়ে যাবে। সবার জন্যে একরাশ শুভকামনা। জয় হোক বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটকের। কেটে যাক অনিশ্চয়তা। এই দুই সেক্টরের সবার মুখে হাসি ফুটুক।
লেখক : সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও নাটক নির্মাতা