নায়করাজ এর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা

কলকাতার ৮ নম্বর নাগতলা রোডের প্রবল অস্থির, চঞ্চল, দুষ্ট প্রকৃতির কিশোর মঞ্চনাটকে অভিনয় করা, আবৃওি চর্চা, ফুটবল খেলা কোনটিই বাদ দেননি । মাএ ৮/৯ বছর বয়সে বাবা মা দুজনকে হারায় । বেড়ে উঠেছিলেন সাংস্কৃতিক পরিবেশে। বাড়িতে বছরে তিনবার যাত্রার আসর বসতো বাবার উদ্যোগে । এতোই চঞ্চল ছিল যে বাড়ি থেকে পালিয়েছে তিন-তিনবার। কিছুদিন কেটেছে রাঁচির জঙ্গলেও। ১৯৬২ সালের ২রা মার্চ খায়রুন নেসা লক্ষীকে বিয়ে করেন। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায় । জীবিকার সন্ধানে কখনো হয়েছেন নাট্যশিল্পী, কখনো টেলিভিশনে কাজ করেছেন, চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন । ১৯৬৬ সালে সুরুর বারাবানকভীর আখেরি স্টেশন ছবিতে স্টেশন মাস্টার, ১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেনে এলাকার ছেলে,ডাকবাবু ছবিতে ডাক পিওন। এরপরেই আসে জহির রায়হানের চলচ্চিত্র বেহুলাতে নায়ক হওয়ার সুযোগ। প্রযোজক ইফতেখারুল আলমের আপওি নতুন ছেলেকে নেবেন না। কিন্তু জহির রায়হান ছিলেন অনড় । রাজজাক না হলে বেহুলা ছবি নির্মাণ করবেন না । অবশেষে বেহুলার অভিশপ্ত লক্ষিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করে ঢাকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে হয়ে যান জনপ্রিয় নায়ক এবং দামি তারকা । সংসার ছবিতে যাত্রাদলের শিল্পী, ময়নার মতি, নীল আকাশের নীচের ট্যাক্সি ড্রাইভার, স্বরলিপি, দর্পচূর্ণ, মধুমিলন, এতোটুকু আশা, অবুঝ মন ছবিতে রোমান্টিক নায়ক । জীবন থেকে নেয়ায় প্রতিবাদী ছাত্রনেতা, ওরা এগার জন চলচ্চিত্রে মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার, রংবাজ ছবিতে রংবাজী, বেইমান ছবিতে করে বেইমানি, বাদী থেকে বেগম ছবিতে অনবদ্য অভিনয়। সাধুর হয় শয়তান, জহিরুল হকের গুন্ডার গুডা, অনন্ত প্রেমে প্রেমিকার জন্য আত্মহত্যা, দিলীপ বিশ্বাসের আসামির আসামি, কখনো প্রজাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে হন পাগলা রাজা, কখনো কাপুরুষ, আবার অশিক্ষিত রহমত ভাই, মাটির ঘরের একচাষা, সখি তুমি কারে ব্যর্থ প্রেমিক, জোকারে একজন জোকার, ছুটির ঘণ্টার স্কুলের দপ্তরি, আনার কলির সেলিম, বদনামে প্রেমিকার জন্য বদনাম কামিয়েছেন, লাইলির হয়েছে মজনু, আবার শরৎ চন্দ্রের হয়েছে চন্দ্রনাথ ও রাজলক্ষ্মীর শ্রীকান্ত, কুসুমপুরের কদম আলী সেজেছেন, কলেজের প্রফেসর হয়ে জজ কোর্টের জজ সাহেব সেজে সৎ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে, আবার দেখা গেছে বাবা কেন চাকর হতে,সমাজকে বদলে দিয়েছেন পিতার আসনে বসে, আমি বাঁচতে চাইতে গিয়ে কোটি টাকার ফকির হয়েছেন, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা চেয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনীও তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে । এই হলো আমাদের নায়ক রাজ রাজ্জাক। ঢাকার চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের চরিত্রে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে সফলও হয়েছেন । শুধু রাজ্জাকের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে চরিত্রগুলির চিত্রায়ন করা । আর চলচ্চিত্রে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন ৬বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও স্বাধীনতা পদক (২০১৫) । এতোকিছুর পরও দর্শকরা তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট নায়ক রাজ রাজ্জাক তার অগণিত ভক্ত, দর্শকদেরকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান। তাঁর আত্মার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ।
ফকরুল আলম সোহাগ