এ দেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর নেপথ্যের কারিগর ও উপদেষ্টা

আজ ৬ আগস্ট। ১৯৫৪ সালের এই দিনে, মহরত অনুষ্ঠিত হয়, এ দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র, আবদুল জব্বার খান পরিচালিত “মুখ ও মুখোশ” এর। তদানিন্তন শাহবাগ হোটেলে অনুষ্ঠিত মহরত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পূর্ব বঙ্গের গভর্নর ইস্কান্দার মির্জা। এ দেশে চলচ্চিত্র নির্মান বিষয়ে, পাকিস্তানের প্রযোজক এফ দোসানির এক বিরূপ মন্তব্যে ক্ষুব্ধ ছিলো, এ দেশের সংস্কৃতি কর্মীরা। বিশিষ্ট কন্ট্রাক্টর ও নাট্য পরিচালক আবদুল জব্বার খান চেস্টা করছিলেন, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত তাঁর ‘ডাকাত’ নাটকটির চলচ্চিত্রায়ন করার। সে সময় খ্যাতিমান কন্ট্রাক্টর কলিম উদ্দিন আহমেদ (দুদু মিয়া কন্ট্রাক্টর হিসেবে খ্যাত) টাকা দিলে, আবদুল জব্বার খান আনুষ্ঠানিক ভাবে, “মুখ ও মুখোশ” ছবির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ঢাকায় সে সময় চলচ্চিত্র নির্মাণের কোন কারিগরি সুবিধা না থাকায়, আবদুল জব্বার খানকে নির্ভর করতে হয়েছিলো পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত স্টুডিওর উপর। তবে এর শুটিং হয়েছিলো এ দেশের লোকেশনে। ফলে এর নির্মাণ ব্যয় বেড়ে গেছিলো, সময় লেগেছিলো অনেক। আরও ক’জনের অর্থ সহায়তায় গঠন করা হয়েছিলো ইকবাল ফিল্মস লিমিটেড। শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা “মুখ ও মুখোশ” ছবির সকল শিল্পী, কুশলী এবং নেপথ্যের মানুষদের প্রতি। এর চিত্রগ্রাহক কিউ এম জামান, অঙ্গসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন শমসের আলী (ছদ্মনাম শ্যাম বাবু), সংগীত পরিচালক সমর দাস, কন্ঠ শিল্পী ছিলেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত, সহকারী সংগীত পরিচালক ধীর আলী, শব্দ গ্রাহক মইনুল ইসলাম এবং সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানের আবদুল লতিফ। প্রধান প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ, আবদুল জব্বার খান, পূর্ণিমা সেন, জহরত আরা (সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী), পিয়ারী বেগম (সে সময় ইডেন কলেজে পড়তেন), আমিনুল হক (সে সময় ঢাকা বেতারে চাকুরীরত), রহিমা খাতুন, বিলকিস বারী প্রমুখ।
এ দেশে ছবি নির্মাণের জন্য, প্রথম যিনি টাকা দিয়েছিলেন তিনি দুদু মিয়া কন্ট্রাক্টর নামেই পরিচিত। ভালো নাম কলিম উদ্দিন আহমেদ। নেপথ্যের এই মানুষটির নাম সামনে আসে স্বয়ং আবদুল জব্বার খান এর মুখ থেকেই। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি’র সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে। সম্বর্ধনার জবাবে বক্তৃতা দিতে গিয়ে আবদুল জব্বার খান বলেছিলেন, “তিনি টাকা দিয়েছিলেন বলেই মুখ ও মুখোশ ছবিটির নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছিলো”। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কে এই দুদু মিয়া কন্ট্রাক্টর। আবদুল জব্বার খানও কন্ট্রাক্টর ছিলেন। পাশাপাশি তিনি নাটকও করতেন। কিন্তু, সে সময়ের খ্যাতিমান কন্ট্রাক্টর কলিম উদ্দিন আহমেদ বা দুদু মিয়া কখনো নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন কথা শোনা যায়নি। এ বিষয়ে তার কোন আগ্রহও দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে উনার ছেলে, প্রখ্যাত নায়ক, প্রযোজক, পরিচালক আলমগীর বলেছিলেন, “কথাটা শুনে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম”। তিনি এ বিষয়ে তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করলে, কলিম উদ্দিন আহমেদ তা স্বীকার করেন। কেন দিয়েছিলেন, এ বিষয়টি জানতেও চেয়েছিলেন। নায়ক আলমগীর বলেছিলেন, “আব্বা শুধু বললেন, একজনের কথায় দিয়েছিলেন, যার কথা তিনি কখনও ফেলতে পারতেন না।” সেই মানুষটি কে, সেটা কলিম উদ্দিন আহমেদ বলেননি। একটু অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, কলকাতায় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহবান করলে দুদু মিয়া কন্ট্রাক্টর লভ্যাংশের স্থানে ০% দিয়েছিলেন। এটা বিস্মিত করেছিলো শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং সে সময়ের উদীয়মান এবং অবিসংবাদিত নেতা, সংগঠক, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে। তাঁরা দুদু মিয়া কন্ট্রাক্টরকে ডেকে পাঠান এবং কথা বলেন। উনার কথায় সকলেই সন্তুষ্ট হন। অত্যন্ত যত্নে, সততার সঙ্গে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন দুদু মিয়া। তখন থেকেই সবার সঙ্গে উনার সুসম্পর্ক বিরাজমান ছিলো। বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর সংগে। এ বিষয়ে নায়ক আলমগীর আরও বলেছিলেন, “আব্বা এ বিষয়ে তেমন কিছু না বললেও, একদিন আমি উনাকে ড্রপ করতে গেছিলাম তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আব্বা যখন ভেতর দিকে যাচ্ছিলেন, তখন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি গাড়িতেই ছিলাম। সেখান থেকেই দেখলাম দুজন দুজনকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। দুজনের মধ্যেই ছিলো উচ্ছাস। আব্বার জন্ম ১৯০০ সালে। বয়সে ২০ বছরের বড়ো। তবুও পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার কোন কমতি আমার মনে হয়নি।”
সে সময় এ দেশে চলচ্চিত্র ব্যাবসার নিয়ন্ত্রণ ছিলো অবাঙালীদের হাতে। “মুখ ও মুখোশ” ছবিটি পরিবেশনার দায়িত্ব নেন, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। ভাষা সৈনিক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর এই একনিষ্ঠ কর্মীই ছবিটিকে সঠিক ভাবে সারাদেশে পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি’র দিন কয়েক আগে ঢাকা জেলখানায় ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তাঁর সঙ্গে যে তিন চারজন ছাত্র দেখা করেন, তার একজন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। জাতির পিতা সে সময় প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। গোয়েন্দা সুত্রে এই দেখা করার খবর পেয়ে একুশ তারিখের আগেই জাতির পিতাকে ঢাকা জেল থেকে ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়। ১৪৪ ধারা জারির ফলে, যে ১১ জন ছাত্র হলের পুকুর পাড়ে গোপন বৈঠক করেন, তাদের মধ্য জাতির পিতার নির্দেশনা অনুযায়ী, আইন মেনে সকালে মিছিল বের করার পক্ষে অটল ছিলেন গাজিউল হক এবং মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। ২১ ফেব্রুয়ারিতে মিছিলে ছিলেন তিনি। গুলিবিদ্ধ একজনকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়েও গেছিলেন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। ১৯৫৬ সালে যখন “মুখ ও মুখোশ” এর নির্মাণ শেষ তখন এর পরিবেশক এবং মুক্তি বিষয়ে কিছুটা শঙ্কা ছিলো। বেশির ভাগ পরিবেশকই অবাংগালী। তাদের কাছে ছবিটি গেলে অবহেলায় এবং অসময়ে, দায়সারা মুক্তি হতে পারে। কারণ ছবিটি নির্মাণ শুরুর আগে থেকেই অবাংগালী প্রযোজক এবং পরিবেশকরা এ দেশে বাংলা ছবি নির্মাণ বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করে আসছিলেন। মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ হয়ে উনার পৈত্রিক প্রদর্শন ও পরিবেশনা ব্যাবসায় জড়িয়ে ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকার অন্যতম বাঙালী পরিবেশক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর ইংগিতে তিনি “মুখ ও মুখোশ” ছবিটি পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করেন। জাতির পিতার ইচ্ছেতেই উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে উপস্থিত হন পূর্ব বঙ্গের তদানিন্তন গভর্নর শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হক। বিষয়টির ব্যাপক প্রচারণাও করেন পরিবেশক মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। ছবিটির অভাবনীয় সাফল্য প্রমান করে, এই দেশ, এই মাটি, এ দেশের আবহাওয়া চলচ্চিত্র নির্মানের উপযোগী। এই প্রমান হাতে রেখেই তদানিন্তন শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রী, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অতি দ্রুত, ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য এফডিসি প্রতিষ্ঠার সকল প্রক্রিয়া তৈরির ব্যাবস্থা করেন। এটি তৈরি হলে ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল এটি প্রাদেশিক পরিষদে উত্থাপন করেন। ভাষা সৈনিক, এ দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য, সবাক বাংলা চলচ্চিত্র “মুখ ও মুখোশ” এর পরিবেশক মোশাররফ হোসেন চৌধুরী আজ বিস্মৃত প্রায়। এই ভাষা সৈনিক পাননি স্বাধীন দেশের একুশে পদক বা অন্য কোন রাস্ট্রীয় সম্মান। আর এ দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর পৃষ্ঠপোষকতা এবং নেপথ্য ভুমিকা যেন অসমাপ্ত রয়ে গেছে আজও।
মুজতবা সউদ
তথ্য সহায়তাঃ আবদুল জব্বার খান এর বক্তৃতা, এম এ আলমগীর (নায়ক আলমগীর), সাইফুল ইসলাম চৌধুরী (প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রদর্শক। মোশাররফ হোসেন চৌধুরীর ভাই), উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া।