জন্মদিনে স্মরণ: উৎপল দত্ত

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— দত্ত কারো ভৃত্য নয়। তাই তো বলতে ইচ্ছা করে মাইকেল মধুসূদন দত্তকুলোদ্ভব কবি হলে উৎপল দত্তকুলোদ্ভব নট। উৎপল দত্ত একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার এবং নাট্যনির্দেশক। কত যে চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, কত যে নাটক তিনি লিখেছেন, কত যে নির্দেশনা দিয়েছেন— ভাবতে অবাক লাগে।
উৎপল দত্ত ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক হতে হতে সেখানেই ফাদার উইভারের প্রশিক্ষণে নাট্যচর্চার সূত্রপাত। ১৯৪৭ সালে গঠন করেন নিজের নাট্যদল। ব্রিটিশ পেশাদার নাট্যদল শেক্সপিয়ারিয়ানা ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার কোম্পানির প্রযোজক জেফ্রি কেনডালের কাছে তিনি শিক্ষিত ও দীক্ষিত হন থিয়েটারি চেতনায়।
১৯৫১ সাল পর্যন্ত ইংরেজি নাটকই করতেন উৎপল। ততদিনে দলের নাম পাল্টে হয়েছে— ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’। বাংলা নাটকের মুল স্রোতে চলে এলেন উৎপল ১৯৫২ সালে, কিন্তু মুলত বিদেশি নাটকের বঙ্গানুবাদ নিয়ে। প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক লিখলেন ১৯৫৮ সালে— ‘ছায়ানট’ নামে।
গিরিজারঞ্জন ও শৈলবালার পাঁচপুত্র ও তিন কন্যার মধ্যে উৎপল ছিলেন চতুর্থ সন্তান। পারিবারিক ধর্মগুরু ভোলানন্দ গিরি, উৎপলের ডাকনাম দিয়েছিলেন ‘শংকর’— যা পরবর্তীকালে উৎপল নিজেই পরিহার করেছিলেন। এমন কি প্রাপ্তবয়স্ক, পরিণত উৎপল তাঁর মুল নাম থেকে ‘রঞ্জন’ শব্দটিও ছেঁটে দিয়েছিলেন।
১৯৫০ সালে মধু বসু পরিচালিত ‘মাইকেল মধুসুদন’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে উৎপল দত্তের চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর। এই ছবিটির সমালোচনায় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ লিখেছিল—নবাগত উৎপল দত্ত নাম ভূমিকায় অভিনয় করিয়াছেন। তাঁহার অভিনয় এমনই বিস্ময়কর যে, মনে হয় এই চরিত্রটি রূপদানের জন্যই যেন তাঁহার জন্ম হইয়াছে।
বিদগ্ধ সমালোচকগণ তাঁকে আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দিয়েছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে উৎপল দত্তের বর্ণময় প্রতিভাদীপ্ত অভিনয়, বলিষ্ঠ চিত্রনাট্য রচনা, অন্যধারার ক্ষুরধার ছবি পরিচালনা এবং বিশ্বের চলচ্চিত্র দুনিয়ার মহানক্ষত্রদের সম্পর্কে মননশীল নিবন্ধ সৃষ্টির তুলনা এ মহাদেশে আর নেই।
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে উৎপল দত্ত মূলস্রোতের বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে পুরোমাত্রায় অভিনয় করতে শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে সৌমেন মুখার্জীর পরিচালনায় ‘কীর্তিগড়’, ১৯৫৭ সালে অজয় কর পরিচালিত বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের অন্যতম সাড়া জাগানো ‘হারানো সুর’ কিংবা ১৯৬০ সালে জীবন গাঙ্গুলীর পরিচালনায় ‘উত্তর মেঘ’ চলচ্চিত্রে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে উৎপল দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৬১ সালে উৎপল দত্ত চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রত হলেন। ২৫ মে মুক্তি পেল উৎপল দত্ত পরিচালিত প্রথম ছবি ‘মেঘ’। ছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য রচনা করেন উৎপল দত্ত এবং সংগীত পরিচালনায় ছিলেন বিশ্ববরেণ্য সঙ্গীতকার রবিশঙ্কর। ১৯৬৫ সালের ২৩ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল উৎপলের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘ঘুমভাঙার গান’।
১৯৬৫ সালে হলিউডের ছবিতে অভিনয় করেন উৎপল দত্ত। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসমাইল মার্চেন্টের পরিচালনায় উৎপল দত্ত অভিনয় করলেন ‘শেক্সপিয়রওয়ালা’ ছবিতে। এই ছবির প্রযোজক ছিলেন জেমস আইভরি। আর শিল্পীরা হলেন উৎপল দত্ত, জেফ্রি কেন্দাল, মধুর জাফরি এবং শশী কাপুর। ছবিটি আন্তর্জাতিক শিল্প মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিল।
১৯৬৮ সালে উৎপল মুম্বাই-এর চিত্রপরিচালক খাজা আহাম্মেদ আব্বাসের ডাকে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘সাত হিন্দুস্তানী’তে অভিনয়ের মাধ্যমে মুম্বাই চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন।
১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ চলচ্চিত্রে উৎপলের অভিনয় প্রতিভার এক অনবদ্য নিদর্শন। এই ছবিতে নাম ভূমিকায় তাঁর বহু মাত্রিক অভিনয় তাঁকে ছায়াছবির শিল্পীরূপে রাতারাতি ভারত বিখ্যাত করেছিল। ১৯৭০ সালে এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ উৎপল দত্তকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘ভরত’ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছিল।
উৎপল অচিরেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের একজন ডাকসাইটে তারকা বনে যান। ১৯৭০ সালে চেতন আনন্দের ‘হীরা রাঞ্ঝা’, ১৯৭১ সালে হৃষীকেশ মুখার্জী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’, ১৯৭৪ সালে শক্তি সামন্তের ‘চরিত্রহীন’ ছায়াছবি মুক্তি পাবার পর মুম্বাই-এর বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে উৎপল দত্তের স্থায়ী আসন পাকা হয়ে যায়। উৎপল দত্ত ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন।
গোপাল দেবনাথ