দেশবরেণ্য কন্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা

দেশবরেণ্য কন্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল গতকাল। তিনি ২০১৯ সালের ২৩ মার্চ, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। বরেণ্য এই সঙ্গীতশিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
শাহনাজ রহমতুল্লাহ ১৯৫২ সালের ২ জানুয়ারি, ঢাকায় জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবা এম ফজলুল হক, মা আসিয়া হক। তাঁর ভাই প্রয়াত আনোয়ার পারভেজ ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক। আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক। মায়ের কাছেই রহমত উল্লাহ’র গানের হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই কন্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। বরেণ্য এই শিল্পী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে। এরপর ওস্তাদ মনির হোসেন, গজল সম্রাট মেহেদী হাসান, শহীদ আলতাফ মাহমুদের কাছেও গানে শিখেন তিনি।
শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র গানের শুরু স্কুল জীবন থেকেই। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করেন। এরপর বহু চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। টেলিভিশনে গাইতে শুরু করেন ১৯৬৪ সাল থেকে। সত্তরের দশকে অনেক উর্দু গীত ও গজল গেয়েছেন তিনি। শাহনাজ রহমতুল্লাহ যেসব চলচ্চিত্রে নেপথ্যকণ্ঠ দিয়েছেন তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য- ইয়ে ভী এক কাহানী, সংগম, গুনাই, ডাক বাবু, বেহুলা, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, সাইফুল মুলক্‌ বদিউজ্জামাল, নয়নতারা, আনোয়ারা,
রাখাল বন্ধু, সাত ভাই চম্পা, বাঁশরী, সুয়োরাণী দুয়োরাণী, আবার বনবাসে রূপবান, এতটুকু আশা, পরশমণি, মুক্তি, ভানুমতি, মধুমালা, অবাঞ্চিত, নীল আকাশের নীচে, পীচঢালা পথ, শীতবসন্ত, পাতালপুরীর রাজকন্যা, আলিঙ্গন, বিজলী, মধুমিলন, আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী, কত যে মিনতি, রং বদলায়, বিনিময়, অধিকার, চোরাবালি, স্মৃতিটুকু থাক, জয় বাংলা, গান গেয়ে পরিচয়, বাহরাম বাদশাহ, আবার তোরা মানুষ হ, অশ্রু দিয়ে লেখা, প্রতিশোধ, ঘুড্ডি, স্বাক্ষী, ছুটির ফাঁদে, প্রভৃতি।
শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র গাওয়া জনপ্রিয় কালজয়ী কিছু গানের মধ্যে আছে- যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়…., সাগরের তীর থেকে…., খোলা জানালা….., পারি না ভুলে যেতে…,
এক নদী রক্ত পেরিয়ে…., ওই ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায়…., আমি সাত সাগরের ওপার হতে…., কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে…., আমার দেশের মাটির গন্ধে…., আমায় যদি প্রশ্ন করে…., একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়…, একতারা তুই দেশের কথা বলরে, এবার বল…, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ…., জয় বাংলা বাংলার জয়…, ইত্যাদি।
১৯৯০ সালে তিনি ‘ছুটির ফাঁদে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলাদেশের সঙ্গীতে অনন্য অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
এছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড-এ আজীবন সম্মাননা’সহ আরো অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
২০০৫ সালে বিবিসি বাংলার এক জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র চারটি গান স্থান পেয়েছে। গানগুলো হলো- ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ এবং ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’।
শাহনাজ রহমতুল্লাহ ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৩ সালে, আবুল বাশার রহমতুল্লাহর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে, তারা হলেন নাহিদ রহমতউল্লাহ এবং এ কে এম সায়েফ রহমতউল্লাহ।
কালজয়ী বাংলা গানের এক কিংবদন্তী কন্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। বাংলাদেশের সংগীত জগতের মিষ্টিকন্ঠের গানের পাখি শাহনাজ রহমতুল্লাহ। শ্রুতিমধুর কন্ঠের আবেশে সংগীতপ্রেমী শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তিনি আমাদের দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে গেলেও, হৃদয়ের সীমানায় থেকে যাবেন, অনন্তকাল।
মুজতবা সউদ