২৬ বছর বয়সেই শ্রেয়া ঘোষাল চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ

উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সুকণ্ঠী গায়িকা শ্রেয়া ঘোষাল। বলা হয় এই প্রজন্মের সেরা গায়িকা তিনি। বলা হবেও বা না কেন, তার মতো জনপ্রিয়তা, সম্মান তার সমসাময়িক আর কেউ তো পায়নি। বাঙালি এই কণ্ঠশিল্পী নিজেকে এতোটাই বিস্তৃত আর বিশাল পরিসরে মেলে ধরেছেন যে, তার পরবর্তী সময়ের শিল্পীরা তাকেই আদর্শ, মাইলফলক মানেন। জন্ম পশ্চিমবঙ্গে হলেও শ্রেয়া ঘোষালের বেড়ে ওঠা রাজস্থানের কোটার নিকটবর্তী রাওয়াতভাতা শহরে। তার বাবা একজন তড়িৎ প্রকৌশলী ছিলেন। পড়াশোনার পর্বটা শুরু হয়েছিল রাওয়াতভাতার পরমাণূ শক্তি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে। তারপর মুম্বাইয়ের এসআইইএস কলেজ অব আর্টস, সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স থেকে ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন শ্রেয়া।
শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়েছিল চার বয়স থেকেই। প্রথমে বাংলা গানের চর্চা করলেও ছয় বছর বয়স থেকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেওয়া শুরু করেন শ্রেয়া। ২০০০ সালে শ্রেয়া ঘোষাল অংশ নেন ‘সারেগামাপা’ সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় এবং তুমুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে জিতে নেন চ্যাম্পিয়ন খেতাব।
‘সারেগামাপা’তে অংশ নেওয়ার আগে থেকেই শ্রেয়া অডিও অ্যালবামে গান শুরু করেছিলেন। তার প্রথম অ্যালবাম ছিল ‘গানরাজ রাঙ্গি নাচাতো’। এটি ছিল লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া একটি মারাঠি গানের কভার সংস্করণ। তার প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম ছিল ‘বেঁধেছি বীণা’। এটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ‘তোতা পাখি রে’, ‘একটি কথা’ ও ‘মুখর’ অ্যালবামগুলো প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
শ্রেয়া ঘোষালের বলিউডে অভিষেক হয়েছিল ব্যতিক্রমভাবে। তিনি যখন ‘সারেগামাপা’-য় পারফর্ম করছিলেন, তখন তার গায়কী পছন্দ করেন নির্মাতা সঞ্জয়লীলা বানসালির মা। একদিন বানসালির মা শ্রেয়ার গান শোনার সময় তাকে ডাকেন এবং শুনেই মুগ্ধ হয়ে যান। এরপর ২০০২ সালে সঞ্জয়লীলা বানসালি তার বিখ্যাত ‘দেবদাস’-এর গানে শ্রেয়াকে নেন। এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সেই পূর্নাঙ্গ গায়িকা হিসেবে প্লে-ব্যাক শুরু করেন শ্রেয়া ঘোষাল।
শুরুতেই বাজিমাৎ করেছিলেন শ্রেয়া ঘোষাল। ‘দেবদাস’ সিনেমায় ‘ব্যয়রি পিয়া’ নামে একটি গান গেয়ে তিনি নতুন সঙ্গীত প্রতিভা হিসেবে ফিল্মফেয়ার আর ডি বর্মণ পুরস্কার জিতে নেন। এছাড়া এই সিনেমায় গানের জন্য শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ফিল্মফেয়ার, আইফা এবং জি সিনে অ্যাওয়ার্ডও উঠে আসে শ্রেয়ার হাতে।
এরপর থেকে কেবল জনপ্রিয়তা আর পুরস্কারময় পথচলা। শ্রেয়া যত গান করেছেন, তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে তরতর করে। আর তার অর্জনের খাতায় যোগ হয়েছে একের পর এক পুরস্কার ও সম্মাননা। শ্রেয়া ঘোষাল একাধারে বাংলা, হিন্দি, তামিল, ভোজপুরি, নেপালি, ওড়িয়া, গুজরাটি, মালায়লাম, মারাঠি, কন্নড়, পাঞ্জাবি ও অসমীয়া ভাষায় গান করেছেন।
শ্রেয়া ঘোষালের সাফল্যমণ্ডিত পথচলাকে নিজেদের জন্য ‘অনুপ্রেরণা’ বলে মন্তব্য করেছেন কানাডীয় সঙ্গীতশিল্পী নেসডি জোন্স, যুক্তরাজ্যের সঙ্গীতশিল্পী রোমা সাগর, ব্রিটিশ ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী ট্রিপেট গ্যারিয়েল ও অনন্যা নন্দা। এছাড়া বহু বিখ্যাত ব্যক্তি শ্রেয়া ঘোষালকে এই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জনপ্রিয়তায় শ্রেয়া ঘোষাল ছাড়িয়ে গেছেন ভারতের সীমানাও। যুক্তরাষ্ট্রে তার বিশাল ভক্তসংখ্যা রয়েছে। সেখানকার ওহাইও রাজ্যে ২০১০ সালের ২৬ জুন দিনটিকে ‘শ্রেয়া ঘোষাল দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
প্লে-ব্যাক গায়িকা হিসেবে শ্রেয়া ঘোষাল ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই তিনি চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। যা ইতিহাসে বিরল। এছাড়া রাজ্যভিত্তিক চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনবার। ফিল্মফেয়ারে চারবার হয়েছেন শ্রেষ্ঠ গায়িকা, ফিল্মফেয়ার দক্ষিণ পুরস্কার পেয়েছেন দশবার, সাতবার আইফা অ্যাওয়ার্ড, ছয়বার জি সিনে অ্যাওয়ার্ড ও ছয়বার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড-সহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন শ্রেয়া।
শ্রেয়া ঘোষাল ১৯৮৪ সালের ১২ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন।

গোপাল দেবনাথ