জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র জন্ম শতবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ার সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান ও মাতার নাম সায়েরা খাতুন। পিতামাতার চার কন্যা ও দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয়। খোকা নামের সেই শিশুটি পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির ত্রাতা ও মুক্তির দিশারী। গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। এক রাজনৈতিক সংগ্রামবহুল জীবনের অধিকারী এই নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসাবে বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন।
বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন। অনন্য সাধারণ নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তর করেন। ১৯৭১-এ মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বে তার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণমন্ত্রের মতোই বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানের সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় খালি হাতে লড়াইয়ে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আবহমানকালের শাশ্বত বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তিনি বাস্তবায়িত করেছিলেন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের মহাপুরুষ শেখ মুজিবের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক। তিনি বাঙালি জাতিকে দিয়ে গেছেন স্বাধীনতা, দিয়েছেন স্বাধীন-সার্বভৌম মানচিত্র আর শস্য-শ্যামল জমিনের ওপর সূর্য লাল পতাকা।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ত্রাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন আদর্শে জাতীয়তাবাদী ও বিশ্বাসে গণতন্ত্রী। তিনি হয়েছেন কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে জননেতা। দেশনেতা থেকে হয়েছেন জাতির জনক। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে একটি দলের নেতা থেকে হয়েছেন দেশনায়ক।
সাধারণের মধ্য থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদ্ভব। তিনি সাধারণ মানুষের আশাকে ভাষা দিতে, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন এবং বছরের পর বছর যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কাটিয়েছেন নির্জন কারাবাসে। মানুষের জন্য হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চকে বেছে নিতে কখনও কুণ্ঠিত হননি। তাই তিনি বাঙালি জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায় অমর হয়ে আছেন।
শেখ মুজিবুর রহমান স্কুল জীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার কৈশোর রাজনীতির দীক্ষাগুরু। কৈশোরেই বঙ্গবন্ধুর কারাবাস শুরু। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদান করায় তিনি জীবনে প্রথম গ্রেফতার হন।
ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম কাতারের রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন এবং ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কলকাতার কলেজ জীবনে বঙ্গবন্ধু এ উপমহাদেশের রাজনীতির স্বাভাবিক আবর্তে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন, বাঙালি আসলে স্বাধীনতা লাভ করেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলাভের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের হাতবদল হয়েছে মাত্র। এ উপলব্ধি নিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে বঙ্গবন্ধু নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে অগ্রসর হন। আত্মপ্রকাশ করে প্রথমে ছাত্রলীগ এবং পরে আওয়ামী লীগ।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়। ’৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার পক্ষে জানায় অকুণ্ঠ সমর্থন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির এ নির্বাচনী বিজয়কে মেনে নেয়নি।
বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্বাধিকার আন্দোলনে এবং চূড়ান্ত পর্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দিয়ে ’৭১-এর মার্চে শুরু করেন নজিরবিহীন এক অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু বজ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেদিন বঙ্গবন্ধু ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকনির্দেশনা দিয়ে দেন।
’৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাংলার মাটি থেকে শেষ হানাদারটিকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ অব্যাহত রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা ও বিদ্রোহের অপরাধে সেখানে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শুরু হয় গোপন বিচার। কোনো কিছুই তার দৃঢ় সংগ্রামী মনোভাবকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালি ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বিজয়ীর বেশে প্রত্যাবর্তন করেন স্বদেশভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে।
বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করে মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজ শেষে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণার অব্যবহিত পর ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট নিজ বাসভবনে ক্ষমতালোভী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলাদেশের রূপকার শেখ মুজিবুর রহমান।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন তার অমর কীর্তি স্বাধীন বাংলাদেশ। একশত এক তম জন্ম বার্ষিকীতে এই প্রার্থনা করি মহান আল্লাহ্ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
রেজাউল করিম রেজা, সাংবাদিক