নিষিদ্ধ পল্লীতে আমি ও উত্তমকুমার : অভিনেতা বিকাশ

আমি আর উত্তম এক সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ পল্লীতে গিয়েছিলাম। না, না, চমকে উঠবেন না, ভয় পাবেন না, আপনাদের গুরুকে বখাতে নিয়ে যাইনি । ব্যাপারটা খুলেই বলি। ১৯৭৬ সালে হাওড়া জেলায় ভীষণ বন্যা হয়েছিল। মনে আছে , অভিনেতা – অভিনেত্রীর তরফ থেকে বেঙ্গল মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা বন্যার ত্রাণের কাজে নেমে পড়েছিলাম। পথে- পথে লরি করে, পায়ে হেঁটে, সঙ্গীত শিল্পীরা গান গেয়ে , অভিনেতা- অভিনেত্রীর দল বাড়ি বাড়ি বন্যার ত্রাণের জন্য চাঁদা তুলতে বেরিয়েছিলাম। একদিন উত্তর কলকাতা , একদিন দক্ষিণ কলকাতা আর একদিন শুধু আমি আর উত্তম কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক কে নিয়ে একদিন সন্ধ্যার আগে উত্তর কলকাতার সোনাগাছি পাড়ার মেয়েদের কাছে ত্রাণের ঝুলি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কি সশ্রদ্ধ, প্রাণখোলা আবাহন যে তাঁদের কাছে পেয়েছিলাম , তা আজও ভুলতে পারিনি। স্পর্শ বাঁচিয়ে দুর থেকে প্রণাম করেছেন, আমাদের ত্রাণের ঝুলি ভরে উঠেছিল তাঁদের দানে। তাঁদের কাছেও সত্যিকারের কোনও কাজের সাহায্যপাথ্রী হয়ে কেউ যেতে পারে, সেই টুকু উপলব্ধি করে তাঁরা কৃতজ্ঞতায় অবনত হয়েছিলেন। আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকাননি পর্যন্ত। শুধু মনেপড়ে , একটি মাত্র মেয়ের কাছ থেকে আমরা কিছুটা যুবতী সুলভ ব্যাবহার পেয়েছিলাম। প্রত্যেকটা বাড়িতে ঢুঁকে আমি আর উত্তম আলাদা আলাদা হয়ে , একতলা , দোতলা , তিনতলার দুদিকের ঘর গুলোর যাচ্ছিলাম, যে যা দান করছিলেন আমরা মাথা নত করে সেই গুলো গ্রহণ করছিলাম। যে মেয়েটির কথা বলছিলাম , সে আমার বাক্সে একটা পাঁচ টাকার নোট ফেলে দিল। আমি চলে আসছিলাম, কিন্তু পেছন থেকে সে বলল , একটু শুনবেন দাদা, আমি মুখ ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাতে , সে বলল একটু দয়া করে যদি ইউ কে কে পাঠিয়ে দেন , তাহলে আরও টাকা দেব । দেখলাম , মেয়েটার চোখে মুখে রোম্যান্টিসিজম , মৃদু মৃদু হাসি। আমি বললাম , “ ইউ কে মানে তো আমাদের উত্তম ! “ সে বলল , হ্যাঁ উত্তমকুমার , আমরা ওকে ইউ কে বলি। ওকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার মতন মেয়ের কোনও দিন হবে ? আমি এসে মেয়েটার কথা উত্তমকে বললাম । সে গেল মেয়েটার ঘরের দিকে।
পঁচিশ টাকা মাটিতে রেখে মাথা নুইয়ে উত্তমকে প্রণাম আর বড়-বড় চোখের চাউনি ভরা একরাশ স্বপ্ন নিয়ে এল। সত্যি কথা বলতে কি, উত্তম আর আমি সেদিন ফিরে এসেছিলাম শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে, বারবার তাঁদের নমস্কার জানিয়ে। আমি যদি পারতাম , তা হলে যাদের কথা বললাম , সেই নিষিদ্ধ পল্লীর পতিতা মেয়েদের নিয়ে একটা গল্প লিখতাম ।
গোপাল দেবনাথ, কলকাতা