রবি ঘোষকে স্মরণ

রবি ঘোষকে কমেডিয়ান বললে ভীষণ রেগে যেতেন। বলতেন— কমেডিয়ান বলে আলাদা কোনও সংজ্ঞায় আমার বিশ্বাস নেই, আমি এক জন চরিত্রাভিনেতা। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঘোষদস্তিদার। যিনি রবি ঘোষ নামেই বিখ্যাত।
‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘অভিযান’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ ছবিগুলিতে একের পর চুটিয়ে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই অভিনেতা।
নায়কোচিত চেহারা না হলেও সে যুগের বাংলা ছবির সমস্ত পরিচালকের প্রিয় পাত্র ছিলেন রবি। তাঁর হাত ধরেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন কত কত সফল অভিনেতা- অভিনেত্রী। বাংলা চলচ্চিত্রের ‘বা-বা’ তো তিনিই।
১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। যিনি পরবর্তীকালে রবি ঘোষ হিসাবে সমাদৃত। আজীবন বাংলা ছবির ‘কমেডিয়ান’ তকমা পাওয়া এই মানুষটি কিন্তু একেবারেই অভিনেতা হতে চাননি।
রবি ঘোষের ছাত্র জীবন কাটে কলকাতার আশুতোষ কলেজে। ছাত্রাবস্থাতেই পড়াশোনার পাশাপাশি চলত নিয়মিত শরীরচর্চা। সেই সময় মাস্‌ল ফুলিয়ে, ছাতি চওড়া করে সিনেমায় ‘হিরো’ হওয়ার চল ছিল না। সুন্দর মুখ আর শক্তিশালী অভিনয়েই প্রত্যেকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে নিজের জাত চেনাতেন।
কিন্তু রবি ঘোষের বডি থাকলেও না ছিল সুন্দর চাঁদপানা মুখ, না ছিল উচ্চতা। তপন সিংহ-এর ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে রবি ঘোষের অভিনয় দেখলে বোঝা যাবে আসল হিরো তো তিনিই। ওরকম দাপুটে অভিনয় আর মানানসই চেহারায় গোটা ছবি জুড়ে একাই দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।
উত্তমকুমার-সৌমিত্রদের যুগেও ভেঙে ফেলেছিলেন স্টিরিওটাইপ তকমা। সিনেমার ভাষ্যে নিয়ে এসেছিলেন একটা অন্য হাওয়া। যে হাওয়ায় সহজেই গা ভাসানো যায়, যে হাওয়ার রেশ থাকে বহু বহু বছর, কিন্তু তাকে ধরা বড্ড শক্ত। কালো, বেঁটে ওই লোকটাই সেই যুগে মিনার্ভা থিয়েটার হাউসফুল করতেন একাই। লোকে বলাবলি করত, রবি ঘোষ মানেই একাই একশো।
রবি ঘোষের অভিনয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই ছিল হাস্যরসের মাধ্যমে সামাজিক রূঢ় বাস্তবিক ঘটনাগুলিকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা। অভিনয়ের আন্তরিকতা ও সংবেদনশীলতা তাঁর প্রতিটি চরিত্রকে নতুন আঙ্গিকে হাজির করেছিল। কে বলবে, ইনি অভিনেতা নয়, বডিবিল্ডারই হতে চেয়েছিলেন! রবি ঘোষ ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
গোপাল দেবনাথ, কলকাতা