বৈশ্বিক এই দুঃসময়ে থমকে গেছে শোবিজ : আলমগীর খান আলম

বৈশ্বিক এই দুঃসময়ে অন্য অনেক কিছুর মতোই থমকে গেছে শোবিজ। কী বাংলাদেশ, কী যুক্তরাষ্ট্র—সব জায়গায় বিনোদন জগৎ এক বড় ধাক্কা খেয়েছে। এই মহাসংকটে জেরবার হয়ে পড়েছেন শিল্পীরা। রীতিমতো আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে।
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে প্রবাসের মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং একে প্রসারিত করতে যারা অনেক বছর ধরে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শো-টাইম মিউজিকের কর্ণধার আলমগীর খান আলম। আগে চরম ব্যস্ততায় সময় কাটত তাঁর। বিশ্রাম নেওয়ার সময়ই ছিল না। অথচ করোনা মহামারির কারণে গত মার্চ মাস থেকে এই আলমগীর খান আলমই ঘরে বসে আছেন। না স্বেচ্ছা বিশ্রাম নয়, বাধ্য হয়ে।
করোনার এ সময় সবকিছুকেই বদলে দিয়েছে। একের পর এক অনুষ্ঠান বাতিল করে দিতে হয়েছে ও হচ্ছে আয়োজকদের। গত ৫ এপ্রিল নিউইয়র্ক নগরে ‘ঢালিউড ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’-এর ১৯তম আসর বসার কথা ছিল। অনুষ্ঠানের মূল চমক ছিল সাকিব আল হাসান ও নার্গিস ফখরি। ইয়র্ক কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠেয় এই অনুষ্ঠানের মঞ্চে থাকার কথা ছিল বাংলাদেশ-ভারতের একাধিক তারকারও। বাংলাদেশ ও প্রবাসের সেরা কণ্ঠশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পীদের অনেকেই এই অনুষ্ঠানের মঞ্চ মাতাতে প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে বলিউড তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও বিপাশা বসুরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। আয়োজক আলমগীর খান বলেন, ভিসা প্রসেসিং হতে শুরু করে অনেক শিল্পীকে কিছু পেমেন্টও করা হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে বন্ধ করে দিতে হয় অনুষ্ঠানগুলো। এতে আয়োজক হিসেবে তাঁকে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হতে হয়।
আলমগীর খান জানান, প্রথম দিকে বছরে দু-চারটি শোয়ের আয়োজন করলেও কয়েক বছর ধরে গড়ে ৮-১০টি বড় শো করতেন। করোনাকালে এখন অনেকটা স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে সেই দিনগুলো। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কোনো অভিজ্ঞতা এবং বিনোদন জগতের মানুষের সঙ্গে তেমন চেনা-জানা না থাকলেও ইয়র্ক কলেজের বাংলাদেশ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুবাদে প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে সাবিনা ইয়াসমীন, শুভ্র দেব, শাকিলা জাফর, মৌ, হানিফ সংকেতসহ বেশ কয়েকজন নামী শিল্পী যোগ দেন।
ওই অনুষ্ঠানের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। হল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। কলেজ বাজেট দিলেও অনুষ্ঠান করতে সে বাজেট থেকে খরচ করতে হয়নি। টিকিট বিক্রির টাকা থেকে অর্জিত আয় দিয়ে প্রোগ্রামের ব্যয় বহন করে উল্টো কলেজের ফান্ডে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেন আলম। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষ খুশি হয়ে ওই অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পিকনিকের আয়োজন করে। এভাবেই আলমের বিনোদন জগতে পদার্পণ। এর পর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অনুষ্ঠান আয়োজক হিসেবে একে একে প্রায় কয়েক শ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন আলম। বর্তমানে নিউইয়র্ক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজক হিসেবে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম বাংলাদেশি আলমগীর খান আলম।
বাংলাদেশের নায়করাজ রাজ্জাক থেকে শুরু করে মৌসুমি, শাবনূর, পপিসহ এই প্রজন্মেরও প্রায় সব নায়ক-নায়িকা, কুমার বিশ্বজিৎ, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন থেকে শুরু করে আজকের নতুন শিল্পীদের প্রায় সবাইকে নিউইয়র্কে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন আলমগীর খান। বাদ যাননি বাংলাদেশি নৃত্যশিল্পী ও মডেলরাও। শুধু নিউইয়র্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্যে তিনি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন এবং এর প্রতিটি অনুষ্ঠানই ছিল দর্শকে ঠাসা।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চান আলমগীর। তিনি বলেন, তিনি যতখানি প্রসারিত করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট। আরও করতে পারলে ভালো লাগবে। তবে এই যাত্রাকে পরের প্রজন্ম আরও এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশাবাদী। দর্শকদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দর্শকেরাই অনুষ্ঠানের প্রাণ। তাই আপনাদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা বাংলাদেশকে ভালোবাসুন; শিল্প-সংস্কৃতিকে ভালোবাসুন। এ দেশে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে লালন করুন, একে পৃষ্ঠপোষকতা করুন। সেই সঙ্গে নিজের ছেলেমেয়েদেরও বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত করুন।’
নিজের পেশা সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালে নিউইয়র্কে আসার পর ১৯৯৮ সালে বাণিজ্য বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এর পর ২০০১ সাল পর্যন্ত এক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই পেশায় আসার কারণ হিসেবে ওই কলেজ অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘কলেজে প্রোগ্রাম করার পর দেখলাম, ভারতের দেব ঘোষ নামের এক ব্যক্তি তাদের দেশ থেকে শিল্পী এনে অনুষ্ঠান করেন। তিনি বাংলাদেশের শিল্পীদেরও আনেন। শিল্পীদের এনে তিনি প্রচুর অর্থ আয় করতেন। তাঁকে দেখে আমি উৎসাহিতও হই এবং চিন্তা করি, তিনি পারলে আমি কেন পারব না। এর পর থেকে আমিই বাংলাদেশের শিল্পীদের এখানে নিয়ে আসি। হানিফ সংকেত আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আইয়ুব বাচ্চুসহ অনেক শিল্পীর সহযোগিতাও আমি পেয়েছি।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিনেমা প্রযোজনা করব। এ জন্য পরিকল্পনা করছি। বাংলাদেশ ও এ দেশে ছবির শুটিং হবে। এ ছাড়া নাটক তৈরি করব। নাটকের কাজ শিগগিরই শুরু করব। আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, অর্থাৎ শো টাইম মিউজিকের ব্যানারেই এগুলো করা হবে। সিনেমায় অভিনয়ের ইচ্ছা না থাকলেও নাটকে অভিনয়ের ইচ্ছা রয়েছে। সবার আগে এই দুঃসময় কেটে যাওয়া জরুরি। সবকিছু যেন আগের মতো ঠিক হয়ে যায়—এটাই চাইছি শুধু। পৃথিবী নতুন সূর্য দেখুক। সবার সুন্দর দিন ফিরে আসুক।’
রোমান রায়