‘যাত্রা’ বাংলার আদি সংস্কৃতি

যাত্রা। বাংলার আদি সংস্কৃতি। কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে, আগে সেই জাতির সংস্কৃতি, কৃস্টি কে ধ্বংস করতে হবে। এমনই এক সুদুরপ্রসারি চিন্তায় ৭৫ পরবর্তী সামরিক সরকার প্রথমেই আঘাত হানে বাংলার আদি সংস্কৃতি ‘যাত্রা’র উপর। এ দেশের মানুষের প্রানের বিনোদন যাত্রা, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যেন আরও সমৃদ্ধ হচ্ছিলো। যার অগ্রদুত ছিলেন ‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত অমলেন্দু বিশ্বাস। ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত জ্যোৎস্না বিশ্বাস সহ আরও কিছু আগুয়ান সংস্কৃতি কর্মী। ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ঘটনার পর, সামরিক শাসকরা প্রথমেই ‘যাত্রা’ শিল্পকে কলঙ্কিত করতে এই শিল্পে প্রবেশ করায় অশ্লীলতা। জনপ্রিয় এই শিল্পের পাশাপাশি এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় তরুণ – যুব সমাজকে মানসিক ভাবে ধ্বংস করার প্রয়াস। সংসদ ভবন আর মানিক মিয়া এ্যভিনিউ এর মাঝের মাঠে আয়োজন করা হয় যাত্রার। আর যাত্রা পালার দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে জুড়ে দেয়া হয় ‘প্রিন্সেস’ নামধারী নারীর অশ্লীল নাচ। সারা ঢাকা শহরের তরুণ যুবারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আলোচনায়, দৈনিকের শিরোনামে উঠে আসে প্রিন্সেস খেতাবধারী লাকী খান এর নাম। খুব দ্রুত, অনেকটা যেন দাবানলের মত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই অসুভ সংস্কৃতি। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় আদি সংস্কৃতি যাত্রা। আধুনিকায়নের নামে, মঞ্চে চলে আসে বিদেশি নাটকের বাংলা বেতার অনুবাদ। চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করার তোড়জোড় তখন থেকেই। প্রনয়ণ করা হয়, ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ এ্যাক্ট’। মুখ থুবড়ে পড়ে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। ওই আইন এখনো বিরাজমান রয়েছে। এতে চলচ্চিত্রের মুল ধারায় তেমন কোন আঁচড় না লাগায়, সেখানেও প্রবেশ করানো হয় অশ্লীলতা। ধাপে ধাপে এর পরিমাণ এতটাই কুৎসিত এবং বিকৃত পর্যায়ে উপনীত হয় যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা অর্থাৎ মুল দর্শকেরা প্রেক্ষাগৃহে আসা বন্ধ করে দেয়। চলচ্চিত্রে নেমে আসে অশনি সংকেত। আগে এ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির মানুষের জন্মদিনে বা মৃত্যুবার্ষিকীতে , উৎসব, পালা পার্বণে রেডিও এবং টেলিভিশনে আয়োজিত হতো বিশেষ অনুষ্ঠান। এখন আর সে সবের বালায় নেই। চ্যানেল বা নিউজ চ্যানেলের বিনোদন অনুস্ঠান বা খবরে এখন ভীনদেশী সংস্কৃতির বার্তা। দীর্ঘ সময়ের সামরিক শাসন বা সামরিক বাহিনী থেকে উৎসারিতা শাসন আমাদের জাতি সত্তাকে ধ্বংস করতে, কৃস্টি ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলো তা আজও অব্যাহত। এখনো মনে হয় সময় পেরিয়ে যায়নি। এখন গনতান্ত্রিক সরকার, স্বাধীনতার পক্ষের সরকার। শুধু দরকার অপশাসন সময়ে তৈরি বিদ্যমান প্রক্রিয়া গুলো দূর করার।
মুজতবা সউদ