পঞ্চাশের দশকে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার এবং গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম ছিল আকাশস্পর্শী………

হাতা গোটানো সাদা বাংলা শার্ট। সাদা ধুতি। কালো ফ্রেমের চশমা। ব্যাক ব্রাশ করা চুল। নম্র উচ্চারণের আলাপচারিতা। রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান। ফিল্মের প্লে ব্যাক থেকে ফাংশনের ম্যারাপ। খাদ থেকে চড়া— সর্বত্র যাতায়াতে অভ্যস্থ দরাজ গলা। ‘ব্র্যান্ড হেমন্ত’র এ সবই ছিল এক একটা ‘আইকনিক’ চিহ্ন। শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ১৯২০ সালের ১৬ জুন বারাণসী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মুখোপাধ্যায় দম্পতির চার ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে হেমন্ত ছিলে‌ন দ্বিতীয়। তার ছেলেবেলা কাটে বহুড়াতে। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর কালীদাসবাবু সপরিবার কলকাতায় এসে উঠেন ভবানীপুর। হেমন্ত প্রথমে ভর্তি হন বাড়ির কাছে নাসিরুদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলে। তার পর মিত্র ইনস্টিটিউশন। প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন হেমন্ত। এই সময়ে বাবার বন্ধু শান্তি বসুর মাধ্যমে পরিচয় হয় শৈলেশ দত্তগুপ্তের সঙ্গে। তিনি তখন কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানির ট্রেনার। গান শুনে হেমন্তের রেকর্ড করালেন শৈলেশবাবু। পনেরো দিনের মধ্যে রেকর্ড বাজারে এলো। সেটা ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাস। ব্যস, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি হেমন্তবাবুকে। দু’মাস অন্তর চারটে রেকর্ড আর রেডিওতে পাঁচটা করে প্রোগ্রাম।
রবীন্দ্র‌নাথের গান সেই অর্থে কোনও প্রতিষ্ঠানে বা গুরুর কাছে শেখেননি। শৈলেশবাবুর কাছেই প্রথম স্বরলিপি ধরে ধরে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা। পঙ্কজকুমার মল্লিকের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়ে অনেকেই তাঁকে ‘ছোট পঙ্কজ’ বলে ডাকতে লাগলেন। এতে তিনি অনুপ্রাণিত হতেন। চল্লিশের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে ব্যাক করলেন হেমন্ত, ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ছবিতে। তার পরে বেশ কিছু ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা। এর মধ্যেই সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে তিনি পর পর কয়েক বছর রেকর্ড করলেন বেশ কয়েকটি গান : ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’ থেকে ‘রানার’— বাঙালি অন্য ভাবে পেল এই জুটিকে। একই সময়ে বের হওয়া তাঁর আধুনিক গানের রেকর্ডগুলিও ভীষণ জনপ্রিয় হয়।
১৯৫১ সালে মুম্বাই পাড়ি দিলেন হেমন্তবাবু, ‘আনন্দমঠ’ ছবিতে সুর করবেন বলে। হিন্দিভাষীরা পেলেন নতুন এক গায়ক— হেমন্তকুমার। তাঁর কণ্ঠে মুগ্ধ তখন প্রায় সারা ভারত। পঞ্চাশের দশকে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার এবং গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম আকাশস্পর্শী। তিনি এ বার নিজেকে নিয়ে এলেন চলচ্চিত্র প্রযোজকের ভূমিকায়। প্রথম বাংলা ছবি মৃণাল সেনের পরিচালনায় ‘নীল আকাশের নীচে’। এর পরে হিন্দিতে করলেন ‘বিশ সাল বাদ’। বেশ কিছু ছবি প্রযোজনা করেন। পাশাপাশি গেয়েছেন অসংখ্য গান। ফিল্মি, আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত— বাঙালি তাঁর গলাতে ছিল সম্মোহিত।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ১৯৮৯ সালের আজকের দিনে (২৬ সেপ্টেম্বর) কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন
বাবলু ভট্টাচার্য