করোনার ডায়েরি

১৪/০৪/২০২০
নাফিসা উমর নামে কাশ্মীরের একটা মেয়ের হৃদয়কাড়া আকুতি ‘ইয়া আল্লাহ্‌! আমাদের উপর যা হচ্ছে তা যেন অন্য কারো উপর না হয়, শুধু তুমি এমন একটা কিছু করে দাও যাতে গোটা পৃথিবী কিছুদিনের জন্য নিজেদের ঘরে বন্দী হয়ে থাকতে বাধ্য হয়, সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়, থেমে যায়। তাহলে হয়তো দুনিয়া এটা অনুভব করতে পারবে যে, আমরা বেঁচে আছি কেমন করে!’ ফেসবুকে পোস্টটা দেখে চোখ আটকে গেল।
বেশ কয়েকটা পোস্টের বরাত দিয়ে এই পোস্টটা দিয়েছেন শরিফুস সালেকিন শাহান। এতে বলা হয়েছে লক ডাউনে্র সময় মেয়েটার সঙ্গে কথা হয়েছিল ইকোনমিক টাইমসের সাংবাদিক অরবিন্দ মিশ্রের। যিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সরকারের বাছাই করা সাংবাদিক হিসেবে কাশ্মী্রে গিয়েছিলেন। তিনি কয়েকদিন আগে ফেসবুকে এই কাহিনী পোস্ট করলে তা ভাইরাল হয়। অরবিন্দ মিশ্রের পোস্টটা অনেক খোঁজ করলাম, পেলাম না।
এই পোস্টে শহিদুল ইসলাম মিরণ নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘এর চেয়ে সিরিয়ার বাচ্চাটার ঐ আবেদন অনেক হৃদয় বিদারক ‘আমি আল্লাহ্‌র কাছে সব বলে দেব’। খোঁজ নিয়ে জানলাম ছবিটা তুলেছিলেন এএফপির সাংবাদিক আরিস্টো মেসিমি। তিনি জানিয়েছেন ছবিটা তোলার সময় বাচ্চাটা ঐ কথা বলেনি এবং তখন মারাও যায়নি।
ভাইরাল পোস্টগুলোর সত্যতার চেয়েও এখানে বড় হয়ে দেখা যায় মানবিকতা। মানূষকে মারার যে উতসব বর্তমান বিশ্বের নেতারা করছে/করেছে, বসনিয়া, সোমালিয়া, ইরাক, মেসিডোনিয়া, আরাকান, প্যালেস্টাইন, কাশ্মীর, সিরিয়ায়, যুক্তি করে, ফন্দি করে নানা দেশে নানা জনপদে নানা উছিলায়, তারই কী প্রাকৃতিক প্রতিশোধ হচ্ছে এখন। ভাববাদী বলে আমাকে অনেকে গাল দেবেন, কিন্তু সাধারন মানুষ এভাবেই দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে মরে নীরবে। তাদের মৃত্যু দেখে উল্লাসে মাতে পাষণ্ড শয়তানের দল। আমার একমাত্র কামনা দরিদ্রের ঐ দীর্ঘশ্বাস যেন আগুনের হল্কা হয়ে যায়। সে আগুন যেন ছার খার করে পুড়িয়ে দেয় মসনদ আর মোসাহেবী গদি।
সিরিয়ার অবস্থা নিয়ে ফোনে আলাপ হলো ইউনিসেফের জয়নাব সুলেইমানের সঙ্গে। শ্যালিকা নাফিসার সহকর্মী। ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে দামেস্ক গিয়ে আর ফিরে আসতে পারেননি।
দামেস্কের সিরীয় নাম শাম। জয়নাব এখন আছেন শাম শহরের একটা আবাসিক এলাকায়। শহরতলিতে নয়। বললেন আট নয় বছর যুদ্ধের সময় যে অবস্থা ছিল এখনো অনেকটা তেমনই। রাস্তা বন্ধ, এলাকা বন্ধ, বন্ধ এলাকায় বাড়ি থাকলেও অনুমতি পত্র না থাকলে ঢুকতে দেয়া হয়না, কিছু দোকান-পাট খোলা আছে, কিছু লোকজন আছে। পরিবর্তন শুধু এই যে, মাথার উপর বোমা পড়ার ভয় নেই। করোনার কারণে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কারফিউ থাকে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কারফিউ শুরু হয় রাত বারোটা থেকে।
জয়নাবদের পরিবার মোটামুটি বড়। ওরা পাঁচ বোন দুই ভাই। চার বোন ও এক ভাই বিয়ে করেছে। তাদের মধ্যে একবোন ও এক ভাই আলাদা বাড়িতে থাকেন। একই রাস্তায় হওয়ায় তারা আলাদা থাকে বলে মনে হয়না। ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাইপো-ভাইঝির সংখ্যা ১১। এখন স্কুল নেই বলে ওদের সবসময় কাছে পাওয়া যাছে। যেটা অন্য সময়ে হয় না।
শহরে দিন যাপনের জিনিষগুলো, বিদ্যুত ও পানি সবরাহ নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু হাসপাতালগুলোয় এখন শুধু জরুরী চিকিতসা দেয়া হচ্ছে। তিনটা বড় সরকারী হাসপাতাল আছে। সেগুলো আর বেসরকারী হাসপাতালগুলো থেকে অনেক স্বাস্থ্য কর্মী চলে গেছে। কোনটাই পুরোপুরি চলছে না। জিনিষপত্রের দাম বেড়ে গেছে প্রায় দেড়গুন। শাক-সব্জি, ফল-মূল পাওয়া যায়, সরকার রুটি পৌঁছে দেয় বাড়িতে।
সিরিয়ার শতকরা ৮০ ভাগ লোক দারিদ্রসীমার নিচে। তার উপর এখন মুদ্রামান অনেক কমে গেছে। আগে এক মার্কিন ডলার ৫০০ সিরীয় পাউন্ডের সমান ছিল। এখন তা ১২০০ সিরীয় পাউন্ড। বেসরকারী খাতের শতকরা ৯০ জন বেকার। এ মাসের পর তাদের অবস্থা কী হবে তা কেউ জানে না। সিরিয়ায় সরকারী বেকার ভাতার ব্যবস্থা নেই। জয়নাবের নিজের এক ভাই আর এক বোন বেকার হয়ে পড়েছে। এ মাসের পর তাদেরকে হয়তো পরিবারের অন্যরা সাহায্য করবে। কিন্তু সারাদেশ এক ভয়াবহ বিপদে পড়তে যাচ্ছে। অনেক মানুষ না খেয়ে থাকবে।
বৃটেনেও অর্থ মন্ত্রী ঋষি সানাক আজ অর্থনৈতিক বিপদের হুঁশিয়ারী দিলেন। বললেন জুন মাসের মধ্যে দেশের প্রবৃদ্ধি শতকরা ৩৫ ভাগ কমে যাবে। সরকারের পক্ষে সব পরিবার বা সব ব্যবসাকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে না। সরকারী হিসেবে আজ হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা ৭৭৮ জন বেড়ে মোট ১২ হাজার ১০৭। আর পরীক্ষিতদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ২৫২ জন বেড়ে ৯৩ হাজার ৮৭৩।
আজ পহেলা বৈশাখ। নববর্ষ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গা, কলকাতা এবং নিউ ইয়র্ক থেকে জনাবিশেক শিল্পী কবি এবং আমি অনলাইনে যুক্ত হয়েছিলাম। কবিতা, গান, নাচ আর আড্ডা ফেসবুকে লাইভ প্রচারিত হতে থাকে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠান চলে। প্রায় সাড়ে চার হাজার জন অনুষ্ঠানটা সরাসরি দেখেন।
আমাদের পরিবারে বেশ বড় করেই পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়। ঢাকার বাইরে কেউ থাকলে এসে যুক্ত হয়। গতবারে আমরাও গিয়েছিলাম। নিয়মিত অনুষ্ঠানটা না হওয়ায় হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের পারিবারিক গ্রুপ পত্রকুঞ্জে সবাই মন খারাপের কথা জানালো। কেউ কেউ কিছু ভর্তা ভাজি রান্নার ছবি দিল। যেসব মানুষ এখন কষ্টে আছে তাদের কথা চিন্তা করে কান্তা বাসায় কোন বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করলো না। বিলাতি স্প্র্যাট মাছের চচ্চড়ি আর মুগের ডাল। আগের বেঁচে যাওয়া কিছু ঢেঁড়শ ভাজি ছিল। স্প্র্যাট আমার খুব পছন্দের, দেখতে চেলা মাছের মত হলেও স্বাদে একদম কাজলী মাছ।
কাজী জাওয়াদ
বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য
উল্লেখ্য: লেখক এর অনুমতি নিয়ে প্রকাশকরা হলো।