করোনার ডায়েরি ১৪

কাজী জাওয়াদ, যুক্তরাজ্য
সকালের রোদটা ছিল চমতকার। এমন দিনে তারে ভোলা যায়, তারে মানে করোনাকে।
রবি শংকরের জন্ম শত বার্ষিকী আজ। নাশতা খেতে খেতে শুনলাম ইয়াহুদি মেনুহিন আর রবিশংকরের বেহালা ও সেতারের যুগলবন্দী। তাঁদের সঙ্গে যখন আল্লা রাখা খান তবলাসঙ্গত করেন তখন তাকে কি আর যুগলবন্দী বলা ঠিক। সেটা হবে ত্রয়ীবন্দী। ‘ওয়েস্ট মিটস ইস্ট’ নামের এই এলবামটা ১৯৬৭ সালে বিলবোর্ডে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লং প্লে রেকর্ডের তালিকায় ১৮ সপ্তাহ ১ নম্বরে ছিল। সে বছর গ্র্যামি পুরষ্কারও পায়। ৭০-এর শীতে শংকরের ‘কত অজানারে’ উপন্যাসে এলবামটির কথা জানতে পারি। পরের বিশ বছরে এটা শোনার সৌভাগ্য হয়নি। বিবিসিতে যোগ দেয়ার পর তা শুনি।
কোনকিছু লিখতে অনেকেরই বড় সমস্যা হয় শুরুটা নিয়ে। জারী, সারি, কবি গান, কীর্তন বা পুথিতে এ থেকে মুক্তি গুরু বন্দনা বা মাতৃ বন্দনায়, যথা- প্রথমে বন্দনা করি প্রভু দয়াময়, তারপরে বন্দনা আমার মাতা ও পিতায়. . . ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ মিহির সেনগুপ্তের ভাটিপুত্রের অপবর্গ দর্শন-এ মাতৃ বন্দনা পড়তে যেয়ে হাসি চেপে রাখা মুশকিল হলো। তিনি কালীমাতার বন্দনা করেছেন। রচনার নামের শব্দ অপবর্গ মানে অপধর্ম বা অতটা ধর্ম অনুসারে নয়। তাঁর বন্দনার প্রথম বাক্য ‘গলায় পাড়া দে মা বদরক্ত বেরিয়ে যাক’। শিবের বুক থেকে গলায় পাড়া দেয়ার আর্জি! কী প্রার্থনা . . . হা হা হা।
বন্দনার বাকিটা পড়ে প্রানভরে হেসে নিতে আর এক কাপ চায়ের জন্য উঠে যেতে হলো। চা খেতে খেতে জানালা দিয়ে দেখি সামনের ফিল্ড মেপলের গাছ দুটোর সরু সরু অসংখ্য ডাল যেন পুতির মালা হয়ে গেছে। পাতার গুটি বের হচ্ছে। একডালে একটা নীলকন্ঠী চড়ুই চির্প চির্প চেচিয়ে কী যেন বলছে। এ গাছদুটো আমার আরো ভালো লাগে শীতের শুরুতে যখন পাতা ঝরতে শুরু করে। ঝরা পাতায় পুরো চত্বরটা এমনভাবে ছেয়ে যায় যেন মনে হয় কারুকাজ করা সোনার পাত দিয়ে কেউ মুড়ে দিয়েছে।
বেলা একটু বাড়লে যায়েন গাড়ি ধোয়ার তোড়জোর শুরু করেছিলো। কিন্তু পরে জানালো শ্যাম্পু ফুরিয়ে গেছে। তাই আজ আর হলোনা।
বৃটেনে আজ স্বেচ্ছাসেবীরা প্রশিক্ষণ শেষে কাজ শুরু করেছে। ১৫ লাখ অতিঝুঁকিতে থাকা লোকের খাবার, ওষুধ কিনে দেয়া, হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা এবং একাকিত্ব কাটানোর জন্য তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার কাজ করবে তারা। প্রথমে ১৫ লাখ লোককে এই সেবা দেয়ার জন্য আড়াই লাখ স্বেচ্ছাসেবী আহ্বান করা হয়। তাতে সাড়া দেন সাড়ে সাত লাখ লোক। তাই ১৫ লাখ সংখ্যাটা বাড়িয়ে ২৫ লাখ করা হয়েছে। তাদের কাজে লাগাতে ব্যবহার করা হবে গুডস্যাম নামের সফটঅয়্যার। লন্ডনে আম্মার (আমার শাশুড়ী)সঙ্গেও কাউন্সিল থেকে যোগাযোগ করেছে। সপ্তাহে একদিন তাঁর পছন্দের কেনা গরম খাবার আর ফলমূল পৌঁছে দেবে।
বিবিসি প্রধান মন্ত্রী বরিস জনসনের স্বাস্থ্যের খবর জানালো। নিবিড় পরিচর্যায় তাঁকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে কিন্তু ভেন্টিলেটর লাগছে না। নিবিড় পরিচর্যায় আজ তার দ্বিতীয় রাত। সরকারের আরেক মন্ত্রী মাইকেল গোভ আজ সঙ্গরোধে গেলেন পরিবারের একজন আক্রান্ত বলে। মনে হয় করোনা ব্রিটিশ সরকারের উপরের দিকেই আক্রমন করেছে।
পাঁচ দিন নিবিড় পরিচর্যায় থাকা ফয়েজ ইলিয়াস নামের সুস্থ হয়ে যাওয়া এক স্বাস্থ্যবান যুবকের সাক্ষাতকার দেখালো বিবিসি। ফয়েজ বললো ভেন্টিলেটরে কষ্ট হচ্ছিলো। সে যখন দম ফেলতে চাইছে ভেন্টিলেটর তখন জোর করে অক্সিজেন ঢোকাচ্ছে।
জাপানে প্রধান মন্ত্রী শিনযো আবে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করলেন আজ। জাপানীরা খুব আইন মানে। তাতেই এই অবস্থা। করোনা ঠেকাতে আর কী বাকি থাকলো, সামরিক আইন?
গত দু’দিন বৃটেনে মৃতের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। আজ আবার সেটা একলাফে ৭৮৬ জনে বেড়ে গেল। মোট মৃত ৬ হাজার ১৫৯। আক্রান্তের সংখ্যা কালকের চেয়ে কমেছে। ৩ হাজার ৬৩৪ জন বেড়ে আজ মোট আক্রান্ত ৫৫ হাজার ২৪২। এখানে দেয়া মৃতের সংখ্যায় কেবল হাসপাতালে মৃতদের গোনা হয়েছে। বার্মিংহামে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫ জন বেড়ে হয়েছে মোট ১ হাজার ৩৭২ জন।
সন্ধ্যায় সৌধ সদস্যদের সঙ্গে অনলাইনে জমাট আড্ডা হলো। কবিতা, গান আর গল্পে ঘণ্টা দু’য়েক খুব আনন্দে কাটলো, মানসিক স্বাস্থ্য একদম ফুরফুরে।
করোনা নিয়ে চাউর হওয়া একটা ক্ষুদে বার্তা কলকাতা থেকে সমর আমাকে পাঠিয়েছে।
‘পুলিশের কাছে অনুরোধ
যারা অপ্রয়োজনে বাইরে ঘুরতে যাচ্ছে, তাদেরকে ডান্ডা না মেরে ৪টি করে পায়খানার ট্যাবলেট খাইয়ে দিন। বলবেন করুনাময়ী টিকা।
দেখবেন ঘরেও থাকবে আবার একটু পর পর হাতও ধোবে।’
বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য থেকে