তাঁর হাতের রান্না খেয়েছি : মুশফিকুর রহমান গুলজার

আজ ৬ এপ্রিল, উপমহাদেশের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় নায়িকা সুচিত্রা সেনের ৯০ তম জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। ১৯৩১ সালের এই দিনে তিনি এই বাংলার পাবনায় জন্ম গ্রহন করেছিলেন।
আমি তাঁকে তাঁর ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিটিতে প্রথম দেখি। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আমি তাঁর অন্ধভক্ত। মহানায়িকার জন্মদিনে আজ আমার একটা স্মৃতির কথা মনে পড়ছে।২০০১ সালের দিকে কোলকাতা গিয়েছিলাম সুচিত্রা সেনের নাতনী অর্থাৎ মুনমুন সেনের মেয়ে রিয়া সেনকে একটা ছবিতে নেবার জন্য কথা বলতে। কোলকাতায় পৌছে মুনমুন সেনের স্বামী ভরল দেব বর্মার সাথে যোগাযোগ করি। সন্ধ্যায় তিনি তাদের বালিগন্জের বাসায় যেতে বলেন। যথাসময়ে তাঁদের বাসায় অর্থাৎ সুচিত্রা সেনের এ্যাপার্টমেন্ট ভবনে গিয়ে হাজির হই। এ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি চতুর্ভূজ আকৃতির; আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের মত। চারদিকে এ্যাপার্টমেন্ট, মাঝখানে ফাঁকা। তবে কলা ভবনের মত এতো বড় ভবন না হলেও বেশ বড়। প্রতি তলার চারদিকে চারটি ফ্লাট। প্রতিটি ফ্লাটের আয়তন সাড়ে তিন হাজার স্কয়ার ফুটের বেশি। সম্ভবত: ( দিক ভূল না হলে ) ৩য় তলার পশ্চিম দিকের ফ্লাটে থাকতেন সুচিত্রা সেন আর দক্ষিন দিকের ফ্লাটে থাকতেন মুনমুন সেন তাঁর স্বামী ও দুই কন্যাকে নিয়ে। দুটি ফ্লাটেরই প্রবেশ পথ দক্ষিন-পশ্চিম কর্ণার দিয়ে এবং এ পাশ দিয়েই দুটি ফ্লাটের ভিতর একটা সংযোগ পথ আছে। মুনমুন সেনের ফ্লাটের ড্রইংরুমটা দুটি ফ্লাটের সংযোগ পথের পাশেই।
সেদিন আবার মুনমুন সেন বাসায় ছিলেন না। তিনি রিয়া সেনের একটি ছবির শ্যুটিংয়ে জন্য তাকে নিয়ে মাদ্রাজ গিয়েছিলেন। আমি কথার শুরুতেই মুনমুন সেনের স্বামী ভরল দেব বর্মাকে বললাম, দাদা, আপনার শ্বাশুড়ির সাথে একটু দেখা করা যাবে? কারন, এটা আমার আজন্মের সাধ।
কথাটা শুনেই আৎকে উঠলেন ভরল দেব বর্মা।অনুনয় করে বললেন, না দাদা, এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। উনি কারো সাথে দেখা করেন না। Sorry দাদা।
বুঝলাম, আমার সাধ বা আশা পূরণ হবার নয়। এরপর আমরা আমাদের কাজের কথা এগিয় নিতে থাকলাম, সাথে সাথে রাতও বাড়তে থাকলো। হঠাৎ দুটি ফ্লাটের সংযোগ পথের দিক থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো। কান খাড়া করলাম। তিনি আবার একটি মেয়ের নাম ধরে ডাক দিলেন। এবার আমি নিশ্চিত সেই চিরচেনা কন্ঠস্বর। কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন স্বপ্নের মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের কন্ঠস্বর।
তারপরও আমি ভরল বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, কার কন্ঠস্বর শুনলাম?
এবার ভরল বাবু একটু মুচকি হেসে বললেন, আমার শ্বাশুড়ি সুচিত্রা
সেনের। আহ। কিছুটা হলেও মনের মধ্যে একটা শান্তির স্রোত প্রবাহিত হলো।
আমি আবার ভরল বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কাকে ডাকলেন?
ভরল বাবু বললেন, আমাদের কাজের মেয়েকে। উনি নিজ হাতে রান্না করেন এবং যা কিছু রান্না করেন তার একটি অংশ আমার দুই মেয়েকে পাঠিয়ে দেন।
আরো কিছুক্ষণ পর সেদিনের মতো আমাদের আলোচনা শেষ হলো। রাতও অনেক হলো। ভরল দেব বর্মা রাতের খাবার গ্রহনের আমন্ত্রন জানালেন। আমরা খাবার টেবিলে গিয়ে বসলাম। আমি প্লেটে খাবার তুলে নিতে গিয়ে দেখলাম, টেবিলের উপর একটা বড় পিতলের/কাসার থালা। সেই থালার উপর কয়েকটি কাসার বাটিতে রান্না করা তরকারি ঢেকে রাখা। আমি আবার ভরল বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, ওই বাটিগুলোতে কী?
ভরল বাবু বললেন, ওই তো আমার শ্বাশুড়ির রান্না করা তরকারি। খাবেন নাকি? খেলে খেতে পারেন। উত্তেজিত হয়ে আমি বললাম, অবশ্যই খাবো। ওইগুলোই আগে দেন।
ভরল বাবু বাটিগুলোর ঢাকনা সরিয়ে ফেললেন। দেখলাম বাটিগুলোতে বিভিন্ন রকমের নিরামিষ তরকারি।
ভরল বাবু প্লেটটি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার যা যা পছন্দ নিয়ে খান।
খুশি আর আনন্দে আমার মনের মধ্যে তখন তোলপাড় চলছে। আমি সুচিত্রা সেনের হাতের রান্না করা খাবার খেতে চলেছি! এটা বাস্তব নাকি স্বপ্ন? মনে মনে বলি, হোক না স্বপ্ন, এমন স্বপ্ন দেখার সৌভাগ্যইবা কয় জনের হয়?
আমি প্রত্যেকটি বাটি থেকে একটু একটু করে মহানায়িকার রান্না করা খাবার আমার প্লেটে তুলে নিয়ে মহাতৃপ্তির সাথে খেতে লাগলাম। সে যে কী স্বাদ!!!
স্বপ্নে নয়, বাস্তবেই সেদিন মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের হাতের রান্না করা খাবার খেয়ে আত্মাকে শান্তি দিলাম।
শুভ জন্মদিন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। যেখানেই থাকে আপনার আত্মা যেন শান্তিতে থাকে।
পুনশ্চ: সবাই ঘরে থাকবেন- নিরাপদে থাকবেন।
মুশফিকুর রহমান গুলজার
সভাপতি
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি