‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান শুনে বাবা-মা জানতে পারেন আমি বেঁচে আছি’

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী একাধারে একজন চিকিৎসক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও মাদকবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সবেমাত্র ডেন্টালে ভর্তি হওয়া এ শিক্ষার্থী। বাবা-মাকে না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে একাকি পাড়ি জমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উদ্দেশে। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি মাদকবিরোধী আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, আমাদের বাড়ি সিলেটে। সেখানে আমার জন্ম হয়। আমার শৈশবও কেটেছে সেখানেই। আমার মা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডা. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী ছিলেন সিলেট গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। মায়ের স্কুলে শিশু স্কুল বলে একটি শাখা ছিল, সেখানেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। এরপর সিলেট গভমেন্ট বয়েজ স্কুলে ভর্তি হই। ক্লাস থ্রি থেকে আমার পাঠ্যসূচির কাজ শুরু হয়। মা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় তার বদলি হলে আমরা মার সঙ্গে চলে যাই খুলনায়। ভর্তি হই সেন্ট যোসেফ স্কুলে। সেখানে কয়েকদিন ক্লাস করি। এরপর মা আবার ময়মনসিংহে টিচার ট্রেনিং কলেজে বদলি হন। তখন ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করি। পরীক্ষা চলাকালীন মা ঢাকায় বদলি হওয়ায় হোস্টেলে থেকে পরীক্ষা দিই। সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদে ভালো রেজাল্টও করেছি। এখনতো একজন পরীক্ষার্থী ঘিরে স্বজনরা উদ্বিগ্ন থাকেন। আমাদের সময় এমন ছিল না। যেহেতু আমাদের পারিবারিক বন্ধনটা সুদৃঢ় ছিল। বাবা-মায়ের অনুশাসনে আমরা চলতাম। ফলে আমাদের আমাদের জীবন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ছিল। পড়াশোনা-খেলাধূলা এর বাইরে কিছু না। সুতরাং বাবা-মাকে স্কুলের সামনে বসে থাকতে হবে—এমন অবস্থা ছিল না। আমাদের পরিবারে এ ধরনের কোনো রীতি-নীতি দেখিনি। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজের ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। পরে ১৯৭১ সালে ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হই। ১৯৭৫ সালে বিডিএস সম্পন্ন করি।
আমাদের সময় ডেন্টালে খুব কম সংখ্যক ছেলেমেয়েই পড়াশোনা করতো। আমি নিজেকে একজন ভাগ্যবান মনে করি যে আমি ডেন্টালে পড়াশোনা করেছি। এটা সারাবিশ্বে সমাদৃত। যুক্তরাষ্ট্রে ডেন্টিস্ট ও আইনজীবীরা সবচেয়ে সমৃদ্ধ। সেভাবে বিবেচনা করলেও উন্নত বিশ্বে ডেন্টিস্টরা শীর্ষে। যদি মেডিকেল সায়ন্স হিসেবে ভাবেন, প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিদ্যার নিত্য-নতুন কলা-কৌশল—সেটাও ডেন্টালে একটি নতুন একটি যুগের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, তখন খুব গান-বাজনা করতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। তখন সমস্ত গণআন্দোলন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হতো। সংগ্রাম কমিটি, সাংস্কৃতিক সংস্থা ছিল। সাংস্কৃতিকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন করতো, সেগুলোতে জড়িত ছিলাম। ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে ২৫ মার্চের কালো রাত্রির পরে যখন শুনলাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছে। এবং বিভিন্ন শিল্পীরা সেখানে চলে গেছেন। তখনই আমি ঘরে থেকে বেরিয়ে যাই, জুন মাসের প্রথম দিকে যখন বের হই; বাবা-মাকে বলিনি। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বিছানায় মশারি টানানো ছিল, এ অবস্থায় আমি বেরিয়ে গেছি। একটি ব্যাগে ছিল একটি জোড়া স্যান্ডেল ও জুতা, একটি শার্ট, একটি প্যান্ট। ঢাকার নীলক্ষেত মোড় থেকে একটি বাস যেতো, সরাসরি দাউদকান্দি হয়ে কুমিল্লা। সেখান থেকে আমি একা আড়িখোলা গ্রাম হয়ে আগরতলা ঢুকে যাই। এখনো শিহড়িত হই, কিভাবে যেতে পারলাম। তখন মিলিশিয়া, পাকিস্তানি আর্মসরা এবং সমস্ত রাজাকাররা দাউদকান্দিতে রাস্তায় রাস্তায় পয়েন্টে পয়েন্টে ব্রাশ ফায়ার করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখ বেঁধে নিয়ে এসে মারছে। এসবের মধ্যে চলে যাই। তখন একটি ভয়াবহ অবস্থা ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা আসছে, বোমা মারছে, পুল-ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছে, পাকিস্তানিদের হত্যা করছে। আগরতলার কলেজটিলাতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ছিলাম এক মাস। সেখানে একটি সাংস্কৃতি দল ছিল, বিখ্যাত পল্লীগীতি শিল্পী সরকার আলাউদ্দিনকে পাই। আমরা একসঙ্গে আগরতলা থেকে কলকাতা চলে যাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতগুলো গান হয়েছে, সবগুলোতে আমাদের কণ্ঠ আছে। বর্তমানে ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রো ভাইস-চেন্সেলর অধ্যাপক নাসরিন আহমদ আর আমি তখন একটি ডুয়েট গান করি। শহীদুল ইসলামের কথা ও হরলাল রায়ের সুরে ‘জ্বলছে জ্বলছে জ্বলছে প্রাণ আমার, দেশ আমার’। এ গানটি খুব সম্ভবত নভেম্বরের দিকে প্রচার হয়। সেদিন আমার নাম ঘোষণা হয়। তখনই আমার বাবা-মা জানতে পারেন, আমি জীবিত আছি। এটি আমার জীবনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বাংলাদেশের সবাই স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতো। এটাই ছিল একমাত্র উৎসাহদাতা। মুক্তিযুদ্ধের বার্তাগুলো পৌঁছে দেওয়া, মানুষকে উৎসাহিত করা, মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে কালভার্ট উড়িয়ে দিচ্ছে, ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছে, রাজাকারদের মারছে—সব তথ্য এর মাধ্যমে পেতো। উদ্দীপনামূলক গানগুলো শুনতো, এসব গানেই আমরা কণ্ঠ দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে যে আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি, আমার জীবনের একটি মাইলফলক। আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্য, আমি ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ডা. মো. ইব্রাহিমের মুখ ও দাঁতের সেবা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমি তৎকালীন আইপিজিএমআরে (পিজি হাসপাতাল) সহকারী অধ্যাপক হিসেবে আমি যোগদান করি। ওই সময় দাঁতের চিকিৎসার জন্য পিজিতে যান ডা. মো. ইব্রাহিম। সেদিন আমাদের বিভাগে কোনো অধ্যাপক না থাকায় ডা. মো. ইব্রাহিমকে আমি দাঁতের চিকিৎসা দিই। এতে তিনি এতই মুগ্ধ হোন যে, বারডেমে ফিরে এসে সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মতিনকে ফোন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি আমাকে চেনেন কিনা, মন্ত্রী বলেন, হ্যা চিনি। তিনি অনেক ভালো, গান করেন, সমাজসেবা করেন। ডা. ইব্রাহিম বললেন, তাঁকে আমার বারডেমে দিয়ে দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, তাকে কিভাবে দেবো? তিনি তো সরকারি চাকরি করেন। তিনি বললেন, ডেপুটেশনের দিয়ে দেন। তখন অর্ডার হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমি পিজি থেকে বারডেমে চলে আসি। এটি একটি অলৌকিক ঘটনা, এমনটি কারও জীবনে হয়েছে কিনা, আমি জানি না। এটা আমার জন্য সৌভাগ্য।
আলমগীর কবির