বংশ পরম্পরায় হৈমন্তী

র্দেশীয় সঙ্গীতাঙ্গনের তরুণ প্রজন্মের গুনী শিল্পী হৈমন্তী। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মেয়ে। সুন্দরী-সুরেলা হৈমন্তী গান করছেন বংশ পরম্পরায়। বংশীয় ভাবেই তার রক্তের সঙ্গে মিশে আছে সঙ্গীতের স্রোতধারা। তাইতো একেবারে ছোট্টটি থাকতেই সুর সঙ্গীতের লয়-তালের সঙ্গে হৈমন্তীর সখ্য। তার ঠাকুরমা ছিলেন পেশাদারী সঙ্গীত শিল্পী। বাবা তবলা বাজাতেন। আর তার মাও সঙ্গীত শিল্পী। সব কিছু মিলিয়ে ছোট্ট হৈমন্তীরও সঙ্গীতে হাতেখড়ি। সঙ্গীতের সঙ্গে উঠাবসা পারিবারিক আগ্রহেই। অন্যদিকে হৈমন্তী তরুন প্রজন্মের সঙ্গীত তারকা হলেও তিনি পেশাদারী গান করছেন সেই অডিও ক্যাসেট এর আমল থেকে। ক্যাসেট সিডির যুগ পেরিয়ে এসে তিনি এখন ইউটিউব যুগেরও গায়িকা। দেশীয় সঙ্গীতের তিন ঘরানা দেখা সুন্দরী-সুরেলা কণ্ঠের গুণী শিল্পী হৈমন্তী সম্প্রতি বিনোদন বিচিত্রা কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার সঙ্গে কথা বলে তাকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন অর্ণব আদিত্য

শুরুতেই হৈমন্তীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তার সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে। তিনি জানান সম্প্রতি ডিএমএস থেকে বের হয়েছে তার সলো অ্যালবাম “দেয়াল কাহিনী”। এতে ছয়টি গান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য গান হলো বর্ষার জল, তুই বিহনে। গান লিখেছেন শেখ রানা ও স্বপ্নীল। সুর ও সঙ্গীত বাপ্পা মজুমদার। অ্যালবামের সাফল্য প্রসঙ্গে হৈমন্তী বলেন, “ডিএমএস থেকে বের হওয়া প্রথম অডিও অ্যালবাম এটি। এর আগে এখান থেকে কোন অডিও অ্যালবাম রিলিজ করা হয়নি। “দেয়াল কাহিনী অ্যালবামটি আমার গানের শ্রোতা-ভক্তরা দারুন পছন্দ করেছে। খুব শীঘ্রি বর্ষার জল গানটি ভিডিও আকারে আসছে।”
দেয়াল কাহিনী এখন পর্যন্ত হৈমন্তীর গাওয়া সর্বশেষ অ্যালবাম। এখন থেকে দুই যুগ আগে ১৯৯৪ সালে হৈমন্তী যখন ক্লাস ফাইভে পড়েন, তখন তার গাওয়া প্রথম অডিও অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। বাসুদেব ঘোষের সুর ও সঙ্গীতে সোনালী প্রোডাক্ট থেকে বের হওয়া ওই অ্যালবামের নাম ছিল “ডাকপিয়ন”। ১২টি গান নিয়ে সিডি ছিল হৈমন্তীর ম্যাচিউরড ভয়েস এর আধুনিক গানের অ্যালবাম। এর আগের বছর অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় তিনি নজরুল সঙ্গীতে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন। একই সময়ে জাতীয় শিশু পুরষ্কারে দেশের গানের চ্যাম্পিয়ন হন। হৈমন্তী বলেন, “সঙ্গীতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার ক্ষেত্রে ওই দু’টি বড় পুরষ্কার ছিল আমার সঙ্গীত ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।” প্রথম অডিও অ্যালবাম “ডাকপিয়ন” এবং সর্বশেষ “দেয়াল কাহিনী”র মাঝে হৈমন্তীর গাওয়া আরও বেশ ক’টি অডিও অ্যালবাম বের হয়েছে। এগুলো হলো “মনে পড়ে তোমাকে”, “প্রেমের ছোয়া”, “স্মৃতির ক্যানভাসে”, “ফিরে দেখা”, “প্রথম প্রেম” এবং “স্বপ্ন দেখি” আসিফ আকবরের সাথে ২০১০ সালে।
বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন এর আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত গায়িকা হৈমন্তী। বর্তমানে তিনি আধুনিক গানের শিল্পী হলেও তার শুরুটা ছিল নজরুল সঙ্গীত দিয়ে। এই প্রসঙ্গে মিষ্টি মুখের মিষ্টি মেয়ে হৈমন্তী মিষ্টি হেসে বলেন, “আমার বরাবরই আধুনিক গানের প্রতি ঝোঁক ছিল।” কিন্তু স্টেজ শোতে, তিনি সব ধরনের গানই করেন। তবে আধুনিক গানই বেশি করা হয়। ফোক গান, হারানো দিনের গানও করা হয়। তিনি বলেন, “ইদানীং আমার গাওয়া হাত বাড়ালেই বন্ধু হবে, তুই বিহনে, যখনই তোমায় দেখি গানগুলো গাওয়ার জন্যে স্টেজে প্রচুর অনুরোধ আসে। আমি শ্রোতা-ভক্তদের অনুরোধ-চাহিদাকে সম্মান রেখে স্টেজে তাই তাদের পছন্দের গানই বেশি গাইবার চেষ্টা করি।”
মানের অর্গল খুলে কথা বলতে বলতে হৈমন্তী তার গায়িকা হয়ে ওঠার কিছু ঘটনা তুলে ধরলেন। তিনি জানান, তার ঠাকুরমা চিত্রা রক্ষিত খুবই সুন্দরী মহিলা ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের ডঃ খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। উনার যখন মাত্র ১৩ বছর বয়স, ওই সময়ে মুম্বাইয়ের কলম্বিয়া রেকর্ডস কোম্পানী থেকে মীরার ভজন গানের লংপ্লে বের হয়েছিল। শিক্ষকতার পাশাপাশি ওই আমলে একজন জনপ্রিয় গায়িকা হিসেবে চিত্রা রক্ষিতের চট্টগ্রামে বেশ নাম ডাক ছিল। হৈমন্তীর বাবা মানস রক্ষিত পেশায় প্রকৌশলী। সরকারী চাকুরে বাবা ভাল তবলা বাজাতেন। আর মা শর্মিষ্ঠা রক্ষিত গৃহিনী এবং তিনি গান অনেক ভালবাসতেন। কিন্তু স্বামী-সংসার-সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরবর্তীতে হৈমন্তীর মা আর পেশাদারী শিল্পী হয়ে ওঠেননি। বাবা-মা দু’জনেই তাই চেয়েছিলেন তাদের মেয়ে হৈমন্তী গায়িকা হয়ে উঠুক। সেই ভাবনা থেকেই বাবা তার বন্ধু বানী কুমার চৌধুরীর কাছে হৈমন্তীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি দেয়ান। হৈমন্তী জানান, পরবর্তীতে বাসুদেব ঘোষের কাছেও সঙ্গীত চর্চা করেন। ওই সময়ে চট্টগ্রামের সানি টিউটরিয়াল মিউজিক ইনষ্টিটিউটেও গান শেখেন। ওখান থেকে ১৯৯১ সালে মাত্র আট বছর বয়েসী হৈমন্তী টোটাল মিউজিক্যাল ইন্সট্রমেন্ট নিয়ে কনসার্ট করেন। সেখানে ক্ষুদে হৈমন্তীর সঙ্গে ২০/২৫ জন মিউজিশিয়ান লাইভ মিউজিক্যাল ইন্সট্রমেন্ট বাজিয়েছিলেন। ওই ধরনের কনসার্ট চট্টগ্রামে ওটিই প্রথম ছিল। হৈমন্তী জানান, নতুন কুঁড়ির পর ওস্তাদ নীরোদ বরণ বড়–য়ার কাছে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত তালিম নেন তিনি। ৯০ এর দশকে চট্টগ্রামের স্টেজ শোতে হৈমন্তী ছিলেন একজন আদরনীয়, আলোচিত ও জনপ্রিয় গায়িকা। স্টেজ, অডিও, টেলিভিশন মিডিয়ার বাইরে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন হৈমন্তী। ২০০৪ সালে শাহ আলম কিরণ পরিচালিত “সাজঘর” ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করেন। গানের কথা ছিল “বদলে যেতে যেতে”। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ইমন সাহা। পরবর্তীতে ‘মনের সাথে যুদ্ধ’, ‘শত্রু শত্রু খেলা’, ‘এই মন শুধুই তোমার’ সহ সর্বশেষ ‘মাতাল’ ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন হৈমন্তী।
কথায় কথায় মিষ্টি মুখের সুরেলা গায়িকা হৈমন্তী জানান, তিনি ভারতের যতীন-ললিত ট্যালেন্ট হান্টে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন। ওই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুবাদে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী বাবুল সুপ্রিয় সুনিধী শান, অলকা ইয়াগনিক, উদিৎ নারায়ন- প্রমুখের সঙ্গে এক মঞ্চে গান গাইবার সুযোগ পেয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা গুণী ও সুন্দরী এই গায়িকার কাছে প্রশ্ন ছিল সাম্প্রতিক সময়ে মিউজিক ভিডিও এবং ভিডিওতে শিল্পীর নিজের মডেল হওয়া প্রসঙ্গে? হৈমন্তীর উত্তর হলো- “অজস্র রাত” এবং “মনের ভেতর” শীর্ষক নিজের দু’টি গানে আমি নিজেই মডেল হয়েছি। আরও অনেক কণ্ঠশিল্পীই তাদের গানে মডেল হচ্ছে। আমি মনে করি এটি ইতিবাছক বিষয়। তবে মিউজিক ভিডিওতে মডেলিং করা যে কতটা কষ্টকর, সেটি ভালো ভাবেই টের পেয়েছি। বুঝতে পেরেছি আমাদের একটি গানের মিউজিক ভিডিও’র জন্যে মডেলদের কতটা পরিশ্রম করতে হয়।” হৈমন্তী আরও জানান, বর্তমানে টিভি স্টেশনের মিউজিক্যাল শো, মিউজিক ভিওি’র কল্যাণে, ইউটিউব উপস্থিতির কল্যাণে শিল্পীদের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে। দেশে-বিদেশের স্টেজ শোও অনেক কমে গেছে। আর অডিও মাধ্যম তো প্রায় ধ্বংসই হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “একটি অ্যালবামে আগে নানা কথার, স্বাদের, সুরের গান ছিল। শ্রোতারা শিল্পীর গায়কী অনুধাবন করতে পারতেন। এখন সেটি শুধু শ্রোতারাই নন, আমরাও মিস করছি। এখন শিল্পীদের শিল্পী স্বত্বা সলো ট্র্যাকে বন্দী।”
সঙ্গীত ক্যারিয়ারে হৈমন্তী এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ড, লেবানন, ভারতের বিভিন্ন স্টেজ শোতে পারফর্ম করেছেন। ২০০৫ সালে প্রেম করে বিয়ে করেন মিউজিশিয়ান ও ব্যবসায়ী অসীম দাশকে। আনন্ত্য ও আদীপ্ত নামের দুই পুত্র সন্তানের জননী তিনি। হৈমন্তী বলেন, “সাংসারিক জীবন আমার খুবই ভালো চলছে। স্বামী অসীমই এখন আমার গান গাওয়ার প্রেরণা। সবশেষে তিনি জানান, গেল রোজার ঈদে সোহেল মেহেদীর সঙ্গে গাওয়া ডুয়েট গান মনের ভেতরে প্রকাশিত হয়েছিল। কোরবানী ঈদে আসবে হৈমন্তীর নতুন একটি সলো ট্র্যাক।
ছবি: এটিএল আকাশ